আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com-এ। ভালো থাকুন সকলে। চলতে থাকুক কলম। বলতে থাকুক শব্দ।

প্রচ্ছদ

A SAHITYA-ADDA Initiative C/O:sahitya A BLOG MAGAZIN STAY WITH US THANK YOU
bloggerblogger
ধারাবাহিক-উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক-উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৪

ধারাবাহিক-উপন্যাসঃ এক আকাশের ঘুড়ি / সৈকত মান্না



                                                ৭
               “এই সানু আজ বিকেলে প্র্যাকটিসে আসবি। সাড়ে তিনটেয় স্টেডিয়ামে।”
শান্তনু কলতলায় দারিয়ে ব্রাশ করছিল। অরিত্রর গলা শুনে পায়ে পায়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়ালো। অরিত্র সাইকেল নিয়ে এসেছে, ওর ওপর থেকেই বলল, “ কি রে কুম্ভকর্ণ! এখন উঠছিস? সকালের প্র্যাকটিসটা তো মিস করলি।”
মুখের থুতুটা সাবধানে গলির ড্রেনে ফেলে শান্তনু এবার মুখ খুলল, “শালা আমার আবার কীসের প্র্যাকটিস? প্র্যাকটিসের নামে তো তোরা তাস পেটাস।”
“ইসস! সক্কাল সক্কাল মুখে কটু ভাষা তোকে মানায় না।
“যা  ভাগ, বাড়ী যা তো।
“হ্যাঁ যাচ্ছি। তুই আসিস কিন্তু ভাই, আমার পার্সোনাল দরকার আছে। প্লিজ ইয়ার।
আচ্ছা যাব।
অরিত্র সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল, আর শান্তনুকে পেছনে ফেলে ক্রমশ ক্ষুদ্র হতে হতে মিলিয়ে গেল বাঁকের আড়ালে। মুখ ধুয়ে কলঘর থেকে নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সকালের চায়ের ফরমাইশটা মায়ের উদ্দেশ্যে রান্না ঘরের দিকে ভাসিয়ে দিয়ে এলো ও। আজ ওকে একটু পড়তে বসতেই হবে, ক্যালকুলাসটা ঠিক মত আয়ত্ত হল না এখনও, অঙ্ক টিউটর কথা শোনাচ্ছে এই নিয়ে। অঙ্কগুলো নিয়ে বসল শানু, কেনি যে এই ১৭ নং অঙ্কটার উত্তর মিলছে না, পরশু ঠিক এখানে এসেই আটকে গেছিল। মা টেবিলে চা রেখে গেছে কাপ থেকে পাক খেয়ে ধোঁয়া উঠছে।  গরম চাটা বড্ড টানছে। হাত বাড়াল শানু। কিন্তু অঙ্কটা...

     “এই ওঠ, ওঠ না বাবা, দ্যাখ কখন থেকে তোর ফোনটা বাজচ্ছে।” ঝাপসা চোখে মাকে দেখতে পেল সানু। মুহূর্তে ফিরে এলো বর্তমানে। ইসস... আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ ঘষতে ঘষতে মায়ের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে দেখল একটা আননোন নাম্বার। সাতপাঁচ না ভেবে, রিসিভ করল। একটা মিষ্টি কণ্ঠ গরগরিয়ে বলে চলল, “নমস্কার, আমি সুতপা, টাটা ডোকোমো শুধুমাত্র আপনার জন্য নিয়ে এসেছে...” বাকিটা শোনার আগেই শান্তনু কুটুস করে ফোনটা কেটে দিল। বিরক্তিকর লাগে এগুলো। হেমাঙ্গিনী ততক্ষণে নিজের কাজে ফিরে গেছেন। ঘড়ির কাটা, ১২ টা ছুঁই ছুঁই। ইসস কি যেন এক ঘুম হয়েছে ওর, সময়জ্ঞান হীন। হাত পা ঝেড়ে উঠে পড়ল, স্নানটা এবার করে নেওয়া উচিৎ। গামছা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে ঢোকার আগে আর চোখে দেখে নিল মা তখনও রান্নাঘরে। যাক।
শাওয়ারটা খুলে দুটো হাত পেতে দিল বৃষ্টি মাখার মত করে। আসলে একে বারে তলায় এসে দাড়াতে ভয় লাগে ওর। ফোঁটাগুলো ভয় দেখায়। কিন্তু এই মিথ্যে বৃষ্টিটাই ওর বড় প্রিয় সময়। আস্তে আস্তে সরে এসে দাঁড়ালো। চোখ বুজে এলো প্রতিবর্তে। ভাললাগে। এই সময়টা ওকে ঠাণ্ডা স্মৃতি দেয়, ও মুচকি মুচকি হাসে। হাসবেই তো। তিথির ওরকম মুখ বেঁকানো দেখলে যে কেউ হেসে ফেলবে। তিথির সাথে তখন শান্তনুর সর্বক্ষণ কথা হয়। মাধ্যম এস এম এস। ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমতে যাওয়া তক। তিথি কখন উঠলো, কখন খেল, কি খেল, কখন স্কুলে বেরল, বাস পেল কিনা, বসার জায়গা পেল কিনা, প্রেয়ার লাইনে দেরি করে পৌঁছেও কি করে বকার হাত থেকে বাঁচল, টিফিনে কি করল, কোন ম্যামের ক্লাসটা বোরিং, আর ফেরার পথে রাস্তার কোন ছেলেটা ওকে লাইন মারল সব। তেমনি সানুর সব খবর তিথিও  জানত। এত কথার বেশির ভাগটা যদিও তিথিই সঞ্চালনা করত। শান্তনুর ছিল একটাই কাজ, সায় দিয়ে যাওয়া আর সাথে খুব করে তিথির পিছনে লাগা। খুব মজা পেতো এমনটা করে। রিতিমত খাউমাউ করে উঠত তিথি। শান্তনু তো হেসে লুটোপুটি খেত। মাঝে শান্তনু তিথিকে পেঁচি বলে ডাকত, অনলি এস এম এসে। একদিন বিনয় স্যারের ব্যাচে বসে
পেঁচি লিখে পাঠিয়েছিল ও। সেদিন তারপর থেকে যতবার শান্তনু তিথির দিকে তাকিয়েছিল ততবার তিথি অদ্ভুত ভাবে মুখ বেঁকিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এসবই মনে করতে করতে ভিজে যায় ও।

               ও যখন স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে ঢুকল সূর্য তখন পশ্চিমে সামান্য ঘাড় হেলিয়েছে। এখনো ঘণ্টাখানেক রোদ হল্কা আনবে হাওয়াতে। ও আর অরিত্র এখন মাঠের ধারে একটা হেলান তেঁতুলগাছের নীচে বসে আছে। কিছুটা দূরেই অভিষেক, তমাল আর রোহিত একটা ত্রিভুজ করে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করছে। দেখতে দেখতে বাকিরাও চলে আসবে। সানু আকাশ দেখছে। চোখের ওপরে ভেসে থাকা ধুলো গুলো স্পষ্ট হচ্ছে মাঝে মাঝে। কষ্ট করে তাকিয়ে থাকতে হয়। সানুর কেন যেন মনে হয় এমনটা করলে চোখ ভালো থাকে। কি জানি কেন মনে হয়।

“আব্বে, ওয় চাতক পাখির বাচ্চা। যেটা বলছি শুনছিস কি?”  
“যা বাব্বা, তুই আবার কখন কি বললি?”
“না মানে, শোন সেটাই তো বলছি। ”
“বল শুনি।”
“বলছি, আগে তুই বল, ক্রিকেট খেলাটাকে নিয়ে তুই কি ভাবছিস?”
“অ্যাঁয়!! কি আবার ভাববো? আমি কি জগমোহন ডালমিয়া নাকি যে ভাববো।’’
“ধুর! ধুর! গবেট, আমি বলছি তোর নিজের ক্রিকেট খেলাটাকে নিয়ে কি ভাবছিস? আচ্ছা আগে শুনেই নে দেন ভাবতে সুবিধা হবে। তুই জানিসই তো ক্রিকেটটাকে আমি কতটা ভালবাসি। মনে প্রানে ক্রিকেট খেলতে চাই কিন্তু এই ভালোবাসাটা একদম ছোট্টবেলা থেকে নয়। শেষ দু-তিন বছর, কিন্তু আমি সিরিয়াসলি খেলতে চাই। বাড়িতে বলেছিলাম, কোচিং ক্লাবে ভর্তি হব। বাবা ব্যাগরা দিলো।’’
“দিলো তো দিলো, তুই কি এখন তোর শোকগাথা শোনাবি ভাবছিস আমায়?”
“কুত্তা, খিস্তি খাবি কিন্তু এবারে, পুরোটা শোন। সো যাই হোক, আমি তারপর হোপ ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু গত সপ্তাহে একটা খবর পেলাম। সেটা হল নাইকের সাথে চুক্তি করে টাটা গোষ্ঠী সারা ইন্ডিয়া থেকে কয়েকজন আন্ডার এইটটিন ক্রিকেটার বাছবে, যারা কিছু বাছাই করা ফাস্ট ডিভিশন ক্লাবে ইয়াংস্টার হিসাবে দু বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হবে। আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বা আমার ইন্টারেস্টের জায়গা কোনটা জানিস?”
সানু সাথে সাথেই বলে উঠলো, “কোনটা?”
“এইখানে যে কেউ ট্রায়ালদিতে পারবে।”
“যে কেউ মানে?
“যে কেউ মানে যে কেউ। কোন অ্যাকাডেমি বা স্কুল টিম, এসব কিছু লাগবে না। আমি পুরো রিসার্চ করেছি। খালি বয়স আঠারোর নীচে তার প্রুফ চাই। ট্রায়াল হবে, রবীন্দ্র সরোবরে। বি এন সিং একাডেমীর মাঠে। আগামী রবিবার সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত। কলকাতার তিনটে ফাস্ট ডিভিশন ক্লাব থাকবে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের মোট চারটে ক্লাব চুক্তিবদ্ধ তার মধ্যে তিনটেই কলকাতার, মানে এখানথেকেই ১২ জন চান্স পাবে অথবা সংখ্যাটা ১৫ ও হতে পারে।”
কিছুটা বিস্ময় নিয়ে শুনছিল বটে সানু, কিন্তু হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু এসব আমায় বলছিস কেন বলত?”
“একটা ঢোঁক গিলে অরিত্র বলল, ভাবছি একটা চান্স নেব। কিন্তু একা না ঠিক সাহস পাচ্ছি না। তুই যাবি রে ত্রায়ালে?”
“আমি!! আমি কি করে যাব?”
“কেন তুই ও তো ভালো খেলিস। আগের দিনই তো ফাটিয়ে বল করলি।”
“ধুর! সেতো অনেকেই করে। তা বলে ফাস্ট ডিভিশন?”
“নয়ই বা কেন?  তুই কি করে জানলি তুই ফাস্ট ডিভিশন খেলার যোগ্য কিনা? আর তোকে ফাস্ট ডিভিশন খেলতেও হবে না। ভাই দু বছরের চুক্তি। ওরা তোকে ট্রেনিং দেবে, তৈরি করবে। আর তোর মধ্যে পটেনশিয়াল আছে। আর আমি নিজেকেও একটা চান্স দিয়ে দেখতে চাই। যদি লেগে যায়। প্লিজ ভাই চল না। আর পুরোটাইতো ফ্রীতে”
সানু পরিপ্রেক্ষিতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বলল না। অরিত্রর আর্জিটা যুক্তিসঙ্গত মনে হল। কিন্তু ক্রিকেট খেলবে সানু? কোনদিনই তো এসব ভেবে দেখেনি। আর পাঁচটা ছেলের মতইও খেলতে ভালোবাসে। এর থেকে এগিয়ে ভাবা হয় নি। কিন্তু অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “দাড়া, আমি একটু ভেবে দেখি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে তমালের গলা শুনতে পেল ওরা। ও চীৎকার করে বলছে। সানু বলটা দে। নীচে তাকিয়ে দেখল ওর পায়ের থেকে এক হাত দূরে সবুজ একটা ডিউস তাকিয়ে আছে ওর দিকে। 

বুধবার, ১৮ জুন, ২০১৪

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ এক আকাশের ঘুড়ি / সৈকত মান্না


                                                                   ৫
                
                 নেকদিন পর আজ আবার ভোরের বটতলাটা দেখল শান্তনু। রাস্তাঘাট ফাঁকা, চারিদিকটা একটু বেশীই উজ্জ্বল সবুজ, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব, যদিও পরপর দুদিন বৃষ্টি হয়নি। ওরা হেঁটে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। ওরা মানে শান্তনু, রোহিত, অভিষেক আর তমাল। তমাল আজ ব্যাপক স্টাইল মারছে, হাতে রিষ্ট ব্যান্ড, পায়ে স্পোর্স সু। অভিষেক বরাবরই শান্ত ধরণের, ও কি যেন একটা ভাবছে আর হাতের ব্যাটটাকে হাওয়াতে ভাসা অদৃশ্য কাল্পনিক বলে হিট করছে। রোহিত ওর সাইকেলটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শান্তনুর এখনও আলসেমি কাটে নি, কাল অনেক রাতে ঘুমিয়ে ছিল আর ভোর না হতেই এদের উৎপাত। শান্তনুকে বাড়ী  থেকে তুলে এনেছে অভিষেকরা। পাঁচটা নাগাদ বাড়ির সামনের গলিতে রোহিতের গলা শুনেই মা খোঁচা দিয়েছিল ওকে। চশমাটা চোখে গলিয়ে দরজা খুলে দেখেছিল বাইরে রোহিতরা, হাতে যুদ্ধের সরঞ্জাম, মানে আজ ওদের একটা ক্রিকেট ম্যাচ আছে, তাই ব্যাট, উইকেট এইসব আর কি। তাই শান্তনুকে দরকার, সে ওর ঘুম মাটি করেই হোক না কেন। তারপর এখন ও এই স্টেশন রোডে। আবার বিছানা ডাকছে শান্তনুকে, বিছানার কথা ভেবেই ও এমন একটা হাই তুলল দেখে মনে হল যেন ওর কতদিনের ঘুম বাকি আছে। পাশ থেকে তমাল ফোঁড়ন কাটল, “ কি রে, এই অবস্থা নিয়ে তুই খেলবি? আজ কিন্তু কাঁপাতে হবে।
-দোত!!! চুপ করত, সক্কাল সক্কাল তুলে এনে আবার ফ্যাচর ফ্যাচর।বলেই শান্তনু একবার অভিষেকের দিকে তাকাল,  ও আবার আজকের খেলাটাকে নিয়ে একটু সিরিয়াস। আসলে আগের হোম গ্রাউন্ড-এর ম্যাচটা ওরা হেরে গেছে। সেদিন শান্তনু খেলেনি, বাড়ী ছিল না ও। তাই আজ ওদের জিততেই হবে। ওরা যাবে ফাঁড়ির দিকে। স্টেশনে অরিত্র, টুকাই আর সাগর এতক্ষণে চলে এসেছে আর প্রতীকের ফাঁড়ির মাঠেই দাঁড়ানোর কথা আছে। প্রায় স্টেশনের কাছা কাছি চলে এসেছে ওরা। রোহিত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তার আগেই কানে এলো স্টেশনের প্রথম অ্যানাউন্সমেণ্ট, ট্রেনটা ঢুকছে। শুনেই অভিষেক, তমাল আর শান্তনু দৌড় মারল, ট্রেনটা ধরতেই হবে। রোহিত পড়লো মহা ফ্যাসাদে ওর তো সাথে সাইকেল। ও সাইকেলেই উঠে পড়লো।
     হ্যাঁ, শান্তনুরা ট্রেনটা পেয়ে গেছে, রোহিত ও পেয়েছে। ও সাইকেলটা গ্যারেজ করে এসেছে। কামরার ভেতরে সবাই বসে আড্ডা মারছে মূলত ম্যাচটা নিয়েই। শুধু ট্রেন-এর দরজায় দাড়িয়ে দুজন শান্তনু আর অরিত্র।
-         কিরে সানু, ওরা তোকে ফ্রেস হতেও দেয়নি না?”
শান্তনু একবার ওর দিকে তাকাল। সানু বলে ওকে খুব কমজনই ডাকে, কিন্তু অরিত্র ওকে বরাবরই সানু বলে... সেই ছোট্ট বেলার বন্ধু বলে কথা।
-         এই খেলাটা ঠিক কাদের সাথে রে?”
-         প্রতীকদের পাড়ার সাথে।
-         অ্যাঁ!! প্রতীকদের পাড়া? কিন্তু ও তো আমাদের হয়ে খেলছে শুনলাম।
-         ধুর! প্রতীক তো পাড়ার থেকে আমাদের সাথেই বেশী থাকে।
-         তাও ঠিক...শান্তনু হয়ত আরও কিছু বলতো, কিন্তু তার আগেই ওর কাঁধে পিছন থেকে একটা হাত রাখল অভিষেক।
-         ভালো করে খেলিস আজ, তোকে দরকার।
শান্তনু শুধু বলল, “ দেখা যাক।

         রান আপ লাইনে শান্তনু। হাতে একটা নতুন সবুজ ডিউস। পাশে অভিষেক কিছু একটা বলছে যেটা কিপ থেকে অরিত্র শুনতে পেল না। কিপ থেকে বিরক্তি ভরা গলায় অরিত্র চেঁচিয়ে বলল, “এই তাড়াতাড়ি শুরু করত।অভিষেক নিজের ফিল্ড-প্লেসে চলে গেলো।
রাইট হ্যান্ড, ওভার দা।শান্তনু এবার বল করবে। একবার মাঠটায় চোখ বুলিয়ে নিল। ফিল্ড সেট আপ মোটামুটি ঠিকই আছে। আটজনে খেলা, বোলার আর কিপার বাদ দিলে ছয়জন, চারটে বাউন্ডারি লাইনে আর দুজন ক্যাচিং পজিশনে, ওর নিজের পছন্দ মতই আছে। শান্তনুর একটু ভয়ও করছে যতই পাড়ার খেলা হোক, প্রথম ওভার এর আগে কোনদিনও যায়নি, বাজে বল করলেই তো আবার মাতৃভাষা প্রয়োগ হবে। যা হবে দেখা যাবে , রানআপ নিল শান্তনু, প্রথম বলটা ঠিক করতেই হবে।  ডেলিভারি ছেড়ে দিয়েছে। গুড লেন্থ বল অফ স্ট্যাম্পের অনেকটা বাইরে দিয়ে বেরিয়ে অরিত্রের হাতে। আবার দৌড়। হাতটা কানের পাশ দিয়ে ঘুরে বলটা ছেড়ে দিল, এবারও অরিত্র হাতে কিন্তু ব্যাটসম্যানের পিছন দিক দিয়ে, ওয়াইড।
শালা, এই তোর শুরু হল তো?” তমালের গলা কানে এলো। শান্তনু ওকে হাত দেখিয়ে আবার রান আপে । এরপরের বলটা আবার একই জায়গায়, ব্যাটসম্যান সুইপ খেলল, বলটা মুহূর্তের জন্য শান্তনুর চোখের আড়ালে, তারপর অরিত্রর গলা, “সাবাস! বোল্ড।”  শান্তনু অবাক, বলটা এতটা সুইং খেল !!!
এবার ওর থার্ড ডেলিভারির সামনে নতুন ব্যাটসম্যান, তার এমন শরীর যে উইকেটটাই দেখা যাচ্ছে না। বলটা আবার সেম জায়গায়, সেম শট, সেম সুইং আর সেম বোল্ড। এবার শান্তনু চিৎকার করে উঠলো, “বোল্ড !!!একটা উচ্ছ্বাস, একরানে দুই উইকেট আর একটা হ্যাট্রিক চান্স। এরকম সুযোগ এই প্রথম। রান আপে যেতে যেতে শান্তনু মনে মনে ভাবছে বলটা  উইকেটের লাইনে রাখতেই হবে, কিন্তু হল না, উইকেটের লাইনে হল না, অফ স্ট্যাম্পের বাইরে... ব্যাটসম্যান ড্রাইভ করতে গেল... বলটা ব্যাটের কানায় লেগে ইন হচ্ছে... উইকেটে... প্লে ডাউন !!!আবার উইকেট আর এবার হ্যাট্রিক। বন্ধুদের চোটপাট, সাবাশির ঝুরি সহ্য করতে হল। বাকি দুটো বল কিছু হল না, বিট, যদিও উইকেট নেবার নেশা হয়ে গেছিল।
এবার শান্তনু ফিল্ডে প্রতীকের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল  কারণ ও বলে গেছে। মনে একটু আনন্দ, জীবনের প্রথম হ্যাট্রিক বলে কথা হোক না পাড়ার ক্রিকেট। একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল এ পাড়ার ছেলেগুলোকে, দেখতে চাইল যাদের আউট করল তাদের রিঅ্যাকশন। অনেকেই ওর দিকে এখনও তাকিয়ে আছে চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে। কিন্তু ওদের ছাপিয়ে অবাক হয়ে গেল শান্তনু নিজেই।  ছেলেগুলোর ভিড়ে কালো বারমুডা পড়ে সিগারেট খাচ্ছে অনি ! আর ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। এটা অনিদের পাড়া? শান্তনু তো জানতই না। অনিও আজ খেলছে নাকি? ফিল্ডিং করতে করতে শান্তনু আবার ওর সমস্যা গুলোয় ফিরে যাচ্ছিল কিন্তু আবার একটা হট্টগোলর মাঠে ফিরে এলো। আউট... তবে কি প্রতীক উইকেট নিল? না রান আউট, টুকাইের থ্রো থেকে। ওভার আপ। আবার শান্তনু বল করতে যাবে, কিন্তু না! ও নিজেই বারণ করল অভিষেককে। কারণ মাঠে ব্যাট হাতে অনি। শান্তনু কেমন যেন ভয় পেল, ও আর বলে যাবে না।
 অভিষেক তাই নিজেই গেল। অনি স্বচ্ছন্দে অভিষেকের বলগুলো ওড়াচ্ছে মাঠের বাইরে, এক ওভারে দুটো ছক্কা আর একটা চার হল। রান গিয়ে দাঁড়ালো তিন ওভারে একুশ। পরের ওভারে আবার ডাক পড়লো শান্তনুর। ও হাত দেখাল অভিষেককে, “পরে যাব।
-         কেন রে? তোর কি হল বলতো, ডোবাবি নাকি?”
-         না হাঁপিয়ে গেছি, পরে যাব বলছি তো।শান্তনু একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল। অভিষেক কি বুঝল কে জানে, ও টুকাইকে বল করতে পাঠাল। টুকাইের ওভারে একটা উইকেট পড়লো বটে কিন্তু অনি এখনও ব্যাটিং করছে। এই ওভারটাও শেষ, এবার তো শান্তনুকে যেতেই হবে। অরিত্র নিজে কিপ থেকে নেমে এলো, “কি ব্যাপার বলতো সানু? তুই কি অনি কে ভয় পাচ্ছিস?”
কথাটা তীরের মত এসে খোঁচা মারল সোজা মাথায়, “এই শোন আমি কাউকে ভয়টয় পাই না বুঝেছিস। দে বল দে আমি যাচ্ছি বোলিং করতে।
সবুজ ডিউসটা এতক্ষণে একটু ময়লা হয়ে এসেছে। ওটা আরও একবার শান্তনুর হাতে। সামনে অনি। শান্তনুর মনে হল অনি ওর দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি হাসছে। বলটা হাতে শক্ত করে ধরে রান আপটা নিয়েই নিল ও। বলটা শান্তনুর হাত থেকে বেরোচ্ছে সাথে একরাশ ক্ষোভ। অনি হয়ত শান্তনুর বলটা খেলতে পারত কিন্তু ক্ষোভ গুলোর জন্যই আর পারল না... অফ স্ট্যাম্পটা মাটি আলগা করে ছিটকে গেল একটু দূরে।
না শান্তনুর মধ্যে কোন বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই। একটা অগ্নিগর্ভ চোখ নিয়ে ও শুধু অনিকে দেখছে আর তর্জনী কথা বলছে, “যা বাড়ী যা।
 
বলটা শান্তনুর হাত থেকে বেরোচ্ছে সাথে একরাশ ক্ষোভ
                                                                 ৬

                        এই নিয়ে চারটে সিগারেট শেষ করল অনি। মাথার শিরাটা রাগে দপদপ করছে। শালা, ঐটুকু একটা ছেলে, যে কিনা আজও সাদা জামা কালো প্যান্ট পরে রোজ স্কুলে ছোটে সে আজ অনির্বাণ রায় চৌধুরীকে আঙ্গুল তুলে দেখানোর সাহস পায়। অনি ভালো করেই বুঝতে পেরেছে ছেলেটা কেন ওকে ইশারা করেছিল। আজ সকালের ম্যাচটা অনিরা হেরে গেছে। ওই শান্তনু ছেলেটাই তো ম্যাচটা উড়িয়ে নিয়ে গেল, সাতটার মধ্যে পাঁচটা উইকেটই তো ওর। ম্যাচ হারা জেতাটা গায়ে লাগে না। কিন্তু অনির্বাণের পেছনে লাগার ফল শালাকে ভুগতেই হবে।
-         এই তখন থেকে কি ধোঁয়া ছাড়ছিস বলতো? শো টা দেখতে যাওয়ার আদেও ইচ্ছা আছে তো?”
বাঁদিকে তাকাতেই অসিতের মুখটা এলো অনির চোখের সামনে, অসিত এক নাগাড়ে মুখ চালাচ্ছে, মনে হয় চুইংগাম খাচ্ছে। অসিত অনির বহু পুরনো বন্ধু ওরা একসাথেই স্কুল পাশ করেছে আর এখন একই কলেজে পড়ছে।
-         কোথায় বলতো?”
-         যাহ্‌ গুরু। আরে পোদ্দার পাড়ায় আজ ফাংশান না, শুনেছি জিৎ গাঙ্গুলি আসছে যাবি তো?”
-         ও হ্যাঁ চল। আগে বাড়ী যাব ভাইকেও বাড়ী থেকে তুলে নেব।
পার্কের রেলিং থেকে নেমে অনি পালসারটা স্টার্ট দিল পেছনে অসিত চড়ে বসল। স্পীড তুলেই পার্কটাকে একবার চক্কর মেরেই মিত্তির বাড়ির পাশের রাস্তাটা ধরল। মিত্তিরদের গলিতে আজ তিথির পড়া থাকে, যদি একবার দেখা পাওয়া যায়। সাতটা থেকে পড়া এখন প্রায় পৌনে সাতটা বাজে, আকাশের সব আলো মুরিয়ে এসেছে। চাঁদটাও মেঘে মোড়া। বর্ষাকাল তাই সারাক্ষণ চাঁদটাও যেন একটা চাদর জড়িয়ে বসে আছে। গলিটা আজ বড্ড অন্ধকার, ল্যাম্পপোস্টের আলোটা মনে হয় আবার চুরি গেছে, তাই হেড লাইটটা জ্বালাতেই হয়েছে। ও বাইকটা চালাচ্ছে বটে কিন্তু মাথাতে বারবার ওই ছেলেটাই ঘুরেফিরে আসছে। অনি প্রথম থেকেই জানত শান্তুনু তিথির বয়ফ্রেন্ড। অনির ভাই তিথির সাথে অঙ্ক ব্যাচে একসাথেই পড়ে। ভাইয়ের সাথেই তিথিকে প্রথম দেখে অনি। তারপর খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে শান্তনুর সাথে তিথি এনগেজ। কিন্তু তাতেও ওর কিছু যায় আসেনি, অনির ক্যালিটাই আলাদা। যেমন আর পাঁচটা মেয়ের সাথে অনি ফ্লাট করে তেমন তিথির সাথেও করা শুরু করেছিল অনি ভালো করেই জানে এই ক্লাসমেট টাইপের রিলেশনশিপ গুলোয় একবার না একবার ইগো ক্ল্যাস হয়েই আর সেই ফায়দাটাই অনিকে তুলতে হবে।
অনি অনেক কষ্ট করেই ওর ভায়ের থেকে তিথির পুরো বায়োডাটা জোগাড় করেছিল আর তারপর ফ্রেন্ডশিপ করতেও বেশ কসরত করেছিল। প্রায় মাসখানেক ধরে পেছনে পড়ে থাকার পর তিথি কথাবার্তায় সড়গড় হয়ে ছিল। আর তারপর একদিন......
-         এই দাড়া, ব্রেক মার।   
অনি আচমকাই ব্রেক মারল, অসিত টানে ওর ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল।    কি হল আবার?”
-         না গুরু, পিংকির সাথে কথা বলেই এখুনি আসছি। একটু ওয়েট কর বস, প্লিজ।
-         কোথায় পিংকি?”
-         আরে ওই তো ছেড়ে এগিয়ে এলি।
অনি পিছনে ফিরে দেখল হাত সাতেক দূরে দুটো মেয়ে দাড়িয়ে আছে। একটা অচেনা মেয়ে তার সাথে অসিতের পিংকি। লাল রঙের স্কাটের ওপর একটা কালো রঙের টপ চড়িয়েছে আজ। অনি মনে মনে ভাবল, সাজের কি বাহার, যতসব নেকি।
    অসিত ওদের সাথে গ্যাজাচ্ছে দেখে ও পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে একবার চেক করে নিল কোন ম্যাসেজ আছে কিনা। না, শুধু ডেট আর টাইমটা হাঁ করে চেয়ে আছে মোবাইল স্কিনে। মোবাইলটা ঘাটতে ঘাটতেই মনে পড়লো তিথিকে একটা ফোন করলেই তো হয়আশেপাশেই কোথাও আছে, টুক করে একবার দেখা করে নেওয়া যাবে। ফোনবুক থেকে তিথির নাম্বার বের করে কল করল, ওপ্রান্তে কলার-টিউন বাজছে...
-         হ্যালো...
-         হ্যাঁ, তিথি... কোথায় আছ?”
-         পড়া আছে আজকে।
-         জানি, পড়তে এসেছ?”
-         হ্যাঁ, যাচ্ছি।
-         একটু দেখা করবে, পাঁচ মিনিটের জন্য? মিত্তিরদের গলিতে আছি।
-         আচ্ছা... আসছি।বলেই ওপ্রান্তের জন লাইনটা কেটে দিল।বেশী অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট পাঁচেক-এর মধ্যেই তিথি এলো সাথে ওর বেস্টফ্রেন্ড সুরভি। এদিকেঅসিত এখনও ওর পিংকির সাথে প্রেমালাপ করছে। কিন্তু সেসব কিছুই দেখল না অনি। তিথির সামনে গিয়ে ও ফিল্মি স্টাইলে বৃষ্টি ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে গলিটাতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। এসব দেখে তিথি কিছু বুঝে উঠে বলার আগেই তিথির চোখে চোখ রেখে অনি বলে ফেলল, “ আই লাভ ইউ তিথি, ডু ইউ.........”  

রবিবার, ১৮ মে, ২০১৪

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ এক আকাশের ঘুড়ি / সৈকত মান্না



                                                         
        অনেকক্ষণ হল বন্ধ দোকানটার শেডের তলায় দাড়িয়ে গা বাঁচাচ্ছে শান্তনু। পা গুলো এবার বাঁধ সাধছে, বলছে আর দাঁড়াব না। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে, তার বাঁকা বাঁকা বিন্দু ছিটকে আসছে শান্তনুর গায়ের এক পাশে। ও যতটা সম্ভব নিজেকে আড়াল করেছে তবু ছাঁটটা তেড়ে আসছে ওর দিকে। নিজেকে বাঁচানোর থেকে পিঠের ব্যাগটাকে বাঁচানোর তাগিদ ওর কাছে অনেক বেশী। নিজেকে কোনদিনই ও বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে চায় নি, প্রতিবারই ভিজতে চেয়েছে কিন্তু  সবসময় হয়ে ওঠে না,  কখনো স্কুলের ব্যাগ তো কখনো দামী মোবাইল বাঁচাতে নিজেকেও বাঁচাতে হয়েছে, আবার কখনো বা মায়ের চোখ রাঙ্গানিকে আড়াল করবার জন্য।
              আজ বৃহস্পতিবার, সকাল সাতটা থেকে ওর অঙ্ক পড়া থাকে। পড়া থেকে ফেরার সময় ভিড় এড়ানোর জন্যই স্টেশন থেকে স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটাকেই আজ বেছে নিয়েছিল শান্তনু। গলিপথ বলে একটু বেশী সময় লাগবে বটে তবে বেশ যেন নিজের সাথে হাঁটা যায় এই রাস্তাটা ধরে। আজ ব্যাচ থেকে বেরিয়েই শান্তনু বুঝেছিল বৃষ্টি নামবে, তবু কেয়ার করেনি, কারণ মেঘগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছিল, ভেবেছিল জুড়তে জুড়তে ও পগারপার । কিন্তু মাঝ পথেই জুড়ে গিয়ে আকাশটা চক্রান্ত করল ওর বিরুদ্ধে। এখন বৃষ্টি বেশ রাজত্ব চালাচ্ছে। রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা করে দিয়েছে, গলিটা যত দূর দেখা যাচ্ছে ততটাই শুধু শূন্যতা আর কেমন যেন একটা ঝাপসা, ধোঁয়াটে ভাব। শান্তনুর ঠিক সামনে যে পাঁচিলটা আছে তার ওপরে প্রায় ৭৫ ডিগ্রি কোনে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঠিকরে পড়ছে আর সুষমভাবে চার টুকরো হয়ে ছিটকে যাচ্ছে চারিদিকে। হঠাৎ শান্তনুর মনে হল আকাশটারও ওপরে কোথাও একটা বেশ বড় কিন্তু বে-রঙ্গিন তুবড়ি জ্বালিয়েছে কেউ। যেটা অনেকটা সময় নিয়ে জ্বলছে আর তার থেকেই এই জল-স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে... যারা তোপ দাগছে প্লাস্টার খসা দেওয়ালটাতে, যেটা আদপে লালচে ইট বার করে আমাদের লালকেল্লার একটা অনুরূপ গঠন করেছে। পাঁচিলের মাথার ওপর আর একটা জিনিসে চোখ আটকে গেল শান্তনুর।  একটা গিরগিটিপুরো সবুজ, ওটা বৃষ্টির মধ্যেও এক্কেবারে স্থির হয়ে আছে, যেন দেখাচ্ছে ওর সহ্যের সীমা কতটা। দেখাক, শান্তনুর কি? ও গিরগিটির সহ্যের সীমা দেখছে না ও দেখছে গিরগিটিটাকে। আসলে ছোটবেলা থেকে কখনো গিরগিটিকে সরাসরি দেখেনি ও, দেখা পেলেই পালিয়ে এসেছে... ওর তখন ধারনা ছিল গিরগিটির দিকে তাকাতে নেই, তাকালে ওরা শরীর থেকে রক্ত শুষে নেয়। এখন অবশ্য সে ভয় কেটে গেছে কারণ এখন সত্যি মিথ্যের ফারাক শান্তনু নিজেই করে। গিরগিটিটাকে দেখতে দেখতেই তুবড়িটা নিভে এলো। ফোঁটারা আবার পরের আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে নিজেদের লুকিয়ে নিল। বাইরেটা এখন অপূর্ব লাগছে... সমস্ত গলিটায় এলোমেলো সোনালি রোদ্দুর ছিটকে ছিটকে পরেছে ঠিক যেন কোন বাঘের শরীর। বৃষ্টির পরই রোদ, বেশ ভাল লাগে। কিন্তু আজ বৃষ্টিটা অনেকটা সময় কেড়ে নিলো শান্তনুর থেকে, বাড়ী গিয়ে স্নান খাওয়া সেরে স্কুলেও যেতে হবে । একটা ছাতা সাথে নিলেই হত। মা বারবার বলেও ছিল। কিন্তু এ যে শান্তনু... এই ছাতা জিনিসটা বড্ড অসস্থিকর মনে হয় ওর কাছে। একটা কালো উদ্ভট জিনিস হাতে করে নিয়ে ঘোরো তাও আবার এমন একটা ঘটনার জন্য যেটা আদেও ঘটবে কিনা সেটা খোদ ভগবানও বলতে পারে না আবহাওয়া দপ্তর তো দুরের কথা। ছাতার কথাতেই মনে পড়লো এমন একজন আছে যে কিছুতেই ছাতা ছাড়া হতে চায় না। তার দয়াতেই আগের বর্ষায় পড়তে যাওয়ার পথে একবারও ভিজতে হয়নি শান্তনুকে। আবার সেই তিথি। শান্তনুর বেশ মনে আছে , বৃষ্টি হলে ওই লাল ছাতাটাতে দুজনের হোক বা না হোক ওটা মাথার ওপরে রাখতেই হত। তিথির মত ছিল, বৃষ্টিকে রোখার জন্য ছাতা তৈরি তাই ছাতা নাকি ব্যবহার করতেই হবে। যদিও শান্তনুর বেশ মজাই লাগত তিথির সাথে এক ছাতার তলায় গা ঘেঁষে যেতে। একটা অদ্ভুত শিহরণ ছিল। ওর ভেজা চুলের ঝাপটা লাগলে মনে হত যেন এক্ষুনি কোথাও একটা বাজ পড়লো।
                গলিটা বড্ড আঁকাবাঁকা কখনো এদিকে বাঁক তো কখনো ওদিকে।  হঠাৎ হঠাৎ সাইকেল গুলো সামনে চলে আসছে। পুরনো কথা ভুলে এবার একটু তাড়াতাড়ি পা চালাল শান্তনু, যেন সময়টার সাথে তাল মেলাতে হবে। কিন্তু সময়টাও যে বালির মত, একটা বাঁক ঘুরতেই ওদের চেনা হলুদ স্কুলবাড়িটা আর তার লম্বা চওড়া কালো গেট, একটু পরেই এখানে আসতে হবে। স্কুলের পাঁচিল ধরে এগিয়ে গেলেই ও বটতলা পেয়ে যাবে। কিন্তু এগোতে পারল না, চোখ কি যেন একটা দেখল আর মস্তিষ্কের ধূসর কোষ সিগন্যাল পাঠাল থেমে যেতে। পা টা থেমেও গেল। স্কুল গেটে কালো একটা পালসার আর তার সামনে একজোড়া, যাদের নাম শান্তনুর লাইফেও এত দিনে জড়িয়ে গেছে। তিথি শান্তনুকে দেখে একটু অবাক, একটু যেন অপ্রস্তুত। আর শান্তনুর মুখে একটা বাঁকা হাসি। ওর দুচোখ যেন তিথিকে বলতে চাইছে, “এতটা খোলাখুলি? ভালই তো আছিস, কিন্তু আমাকে না দেখালেও পারতিস।তিথিকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে তিথি চাইছে শান্তনু এখান থেকে চলে যাক। কিন্তু শান্তনু কি বুঝল কে জানে সরাসরি এগিয়ে গেল ওদের দিকে, অনিকে অগ্রাহ্য করে তিথিকে প্রশ্ন করল, “কি রে কেমন আছিস?... অবশ্য দেখে তো মনে হচ্ছে ভালই আছিস। তা আমাদেরকেও একটু মনে রাখিস, ফোন-টোন তো আজকাল করিস না আর, নাম্বারটা কি করে হারিয়ে ফেলেছিস?” তিথি জাস্ট হা করে তাকিয়ে আছে। শুধু শান্তনুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, কি জবাব দেবে? আদেও দেবে কিনা কিছুই মাথায় আসছে না ওর।
শান্তনু তিথির উত্তরের অপেক্ষাতেও নেই , ওর চোখ এবার ঘুরে গেছে অনিকে লক্ষ করে, “কেমন আছ বস? সব ঠিকঠাক তো।অনি ও অবাক। এই ছেলেটাকে অনি ভালো করেই চেনে আর সব কিছুই জানে ওদের সম্পর্কে তাই ওর মনে একটা চাপা গর্বও আছে নিজেকে নিয়ে। কিন্তু অনি কোনদিনও শান্তনুর সাথে কথা বলে নি আর আজ হঠাৎ কি যে হল? কি বলবে ও?
-         আচ্ছা চলি, আজ একটু তাড়া আছে হ্যাঁ, আসি।
শান্তনু এবার বাড়ির পথ ধরল, পেছনে দুই হতবাক। সবচেয়ে বেশী তিথি। ও কোন সানুকে দেখল? যে শান্তনু জ্বলছে তার আগুনটার হল্কা কি টের পেল তিথি? শান্তনু মনে মনে হাসছে, অনেক দিন পর আজ ও এমন একটা কাজ করেছে যেটা ও ভেবে চিন্তে করেছে। আর মনটা বলছে, “বেশ করেছিস।


                                                         
                  অনেকক্ষণ ধরে ঘরের নীল নাইটল্যাম্পটা জ্বলছে। এখন চোখ সয়ে এসেছে তিথির। মনটা আজ কোন এক ভয়ঙ্কর শক্তিশালী মাকড়শার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে, সারা দুপুর ধরে অনেক চেষ্টা করেছে, এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে... জট তো খোলেইনি উল্টে আরও গাঁট পরেছে।
                ‘আবঝা আলোয় মনটা স্পষ্ট হয়’—এই থিয়োরিটা শান্তনুর, ও এইভাবেই ভাবত। তিথি ওর কাছ থেকেই শিখেছিল। আর আজ ওই ওর থিওরিটাকে পাল্টে দিয়েছে , শান্তনু আজ এমন ভাবে চড়ে বসেছে তিথির মাথায় যে তিথি কিছু ভাবতেই পারছে না। আজ বিকেলের পড়াটাও কামাই করেছে তিথি, মোবাইলটাও সুইচ অফ। সকালে শান্তনুকে দেখেছে তিথি, আজ আবার তিথি শান্তনুর চোখে তাকিয়েছিল কিন্তু আজ বুঝতে পারেনি শান্তনুকে, যেমন আগেও বুঝতে পারত না। প্রথমবার যখন শান্তনু আর তিথির দেখা হয়েছিল সেদিন তো তিথির সাথে কথাই বলে নি শান্তনু। সেটা ছিল একটা পড়ার ব্যাচ, শনিবারের বিনয় স্যারের ফিজিক্স ব্যাচ। তখন ক্লাস ইলেভেনের শুরু... পুরনো চেনাজানাদের সাথে এক ঝাঁক নতুন মুখ। তাদের মধ্যে ছিল শান্তনুও। সেদিন ও সবার শেষে পড়তে এসেছিল। পড়ার সময় ছিল ৬ টা আর ও ঢুকেছিল ৭টা ১০ এ। পড়ার ঘরের দরজায় দারিয়েই মাথা নিচু করে শুনেছিল স্যার এর অগ্নিগর্ভ গলা। স্যার যখন জিজ্ঞেস করেছিল। এত দেরি কেন শান্তনু?” তখন ও খুব স্পষ্ট গলায় কেটে কেটে বলেছিল , “আপনি তো ৬ টা বলে প্রতিদিনই সাড়ে ৭ টা থেকে পড়ান, আমি কি করে বুঝব আজ তাড়াতাড়ি শুরু করবেন?” স্যার একটু থতমত খেয়ে চুপ করে গেছিল আর দরজার ঠিক সোজাসুজি বসা তিথিরা সবাই মুখ টিপে হেসেছিল। সেদিন তারপর আর কারোর সাথে একটাও কথা বলেনি শান্তনু। আবার পরদিন ব্যাচেই দেখা ওর সাথে, সেদিনও দেরি কররে এন্ট্রি নিয়েছিল ও। তখন ঘরে জোরকদমে চলছে ছেলে বনাম মেয়েদের দন্ধযুদ্ধ মানে ওই বাকযুদ্ধ। আর অনায়াসে তাতে ছেলেদের পক্ষে ইন্ধন জুগিয়েছিল শান্তনু। সেইবারই প্রথম কথা বলা। মানে প্রথম কথা কাটাকাটি, তাও ইনডায়রেকলি। তারপরও একমাস শান্তনু তিথির সাথে সরাসরি কথা বলতো না। মাঝে মাঝে শুধু তাকাত। আর আজ তিথির সেই চেনা সানু ভেঙ্গে চুরমার, যে ছেলেটা কারোর সাথে যেচে কথা বলতো না আর আজ সে কিনা অনির সামনে তিথিকে এই ভাবে অপদস্থ করল? তিথি ভাবতেই পারছে না।
                কিন্তু এসবের জন্য দায়ী কে? তিথি? সত্যিই তো। তিথিই তো শান্তনুকে ভালবেসেছিল, তবে কি তিথিই ওকে বদলে দিল? শান্তনু কি তিথিকে আজও ভালবাসে? না, ভালবাসে না ছাই? যে নিজের ভালবাসা জাহির করতে পারে না তার আবার ভালবাসা। রহিতই যদি সেদিন তিথিকে না বলতো যে শান্তনু ওকে ভালবাসে তবে তো তিথি কোনদিনই জানতে পারত না শান্তনুর মনের কথা। হ্যাঁ, রোহিত শান্তনুর বেস্ট ফ্রেন্ড, শান্তনু রোহিতের সাথে সবকথা শেয়ার করত তখন। কথায় কথায় কোন একদিন শান্তনু রোহিতকে বলে ফেলেছিল যে ওর তিথিকে ভাল লাগে আর ব্যাস, পেট-পাতলা রোহিত সেটা ফাঁস করে দিয়েছিল তিথির কাছে। তারপরের সব ঘটনার জন্যই তো আজকের এই দিনগুলো। না রোহিত ওই কথা গুলো বলতো না শান্তনু আর তিথির মধ্যে কোন সম্পর্ক হত, আর না তিথি নিজেকে দোষী মনে করত সানুর এই পরিবর্তনের জন্য। হোক দায়ী তিথি। তবে শান্তনু কে ওকে অপমান করার? ও আজ ফোন করার কথা বলছিল না? হ্যাঁ,তিথি তিন মাস ফোন করেনি শান্তনুকে, বেশ করেছে করেনি। তবে আজ করবে, হ্যাঁ এক্ষুনি করবে আর জিজ্ঞাসা করবে আজকের ব্যাবহারের মানেটা কি? কি ভেবেছেটা কি ও নিজেকে?
            বিছানা হাতরিয়ে ফোনটা পেল তিথি। সুইচটা অন করল। একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছে, মোবাইলটা কল করার জন্য এক্ষুনি তৈরি নয়। এবার টাওয়ারটা এলো। ফোনবুক ঘেঁটে নাম্বারটা পেল।  কলিং সানু”... আবার অপেক্ষা... ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জানান দিল নাম্বারটি এই মুহূর্তে নট রিচেবেল। নট রিচেবেল? মানে সুইচ অফ না... তবে কি সিম খোলা আছে? কে জানে? ভাবনা আর জল্পনা কল্পনার ফাঁকেই দুটো পেডিং ম্যাসেজ ঢুকে গেল, দুটোই অনির।

প্রথমটা-তিথি, আজ সকালের ঘটনা নিয়ে কিছু ভেবো না, আমি কিছু মনে করিনি। আর ওই ছেলেটার কথাও ভেবো না... নন্‌সেন্সটাকে আমি দেখে নেব।দেখে নেব... মানে? ভ্রুটা একটু বাঁকল তিথির আর দ্বিতীয়টা—“ কি গো, ফোনটা কি করে রেখেছ? কল, ম্যাসেজ কিছুই যাচ্ছে না। পারলে কন্টাক্ট করো।এটা মনে হয় একটু আগেই পাঠিয়েছে। তিথির এখন ভালো লাগছে না অনি কে ফোন করতে। ও  দরজা খুলে হল ঘরে এলো। দাদু সোফায় বসে আছে, চোখ টিভির পর্দায়, ওর দিকে খেয়াল করবার ফুরসত নেই। মা বাবা আজ বাড়িতে নেই। রিনা অ্যান্টির বাড়ী গেছে, তিথির ছোট পিসি, রাত্রেও ফিরবেন না। তাই হলঘরটা একটু ফাঁকা না হলে এখন সবাই ভিড় করে সিরিয়াল দেখত। দাদু এখন খবর শুনছে। তিথি পাশ কাটিয়ে ছাদের সিঁড়ি ধরল। ওদের ঘেরা ছাদ... পাঁচিলটা কোমর সমান বলে মাথা বার করে
সরাসরি নীচের রাস্তাটা দেখা যায়, সাধারণত যেটা দোতলা-তিনতলা বাড়িতে প্রায়ই হয়না। ওদেরটা দোতলা। নীচের রাস্তায় দু-এক জন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে... ওদের গলিটায় একটাই ল্যাম্পপোস্ট...তার চারিদিকটায় গোল হয়ে আলো ছড়িয়ে আছে। ওপর থেকে কোন ক্যারমবোর্ডের উপরে ঝোলানো আলোর মত দেখতে লাগছে। ওই ল্যাম্পপোস্টের পাশেই টানা পাঁচদিন দাড়িয়ে ছিল অনি, সারাটা দিন, যতক্ষণ না পর্যন্ত তিথি স্কুলের জন্য বাড়ী  থেকে বের হয়। দেখা হলে একটাই কথা, “সরি তিথি, সেদিন সিনেমা হলে আমি ঠিক বুঝতে পারি নি... ঘোরের মাথায়... ভুল করে... সরি। প্লিজ।প্রথম দুদিন তিথি যাচ্ছেতাই ভাবে অপমান করেছিল। কিন্তু তারপরেও অনিকে দারাতে দেখে রাগ ধীরে ধীরে ভেঙ্গে গেছিল। তারপর আবার একটা সুযোগ দিয়েছে তিথি অনি কে। এই যে তিথি অনিকে বার বার সুযোগ দিছে আর শান্তনুর বেলায়? কিন্তু সানু তো পুরো অন্যরকম, ও কি একবার ও সুযোগ চেয়েছে না চাইত? ও সবসময়ই নিজেতে ব্যস্ত। পারত ও অনির মত তিথির জন্য সব কাজ ফেলে এক সপ্তাহ হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে? তিথি শান্তনুকে জানে, ও করত না। প্রতিটা ঝগড়ার কইফিয়ৎ শুধুমাত্র তিথিকে দিতে হয়েছে। আজও তাই তিথি নিজেকে দোষী ভাবছে। না, ও দোষী নয়। আর দোষী হলেও, সব দোষ ওর একার নয়।

                                                                                               (ক্রমশ)

মঙ্গলবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৪

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ এক আকাশের ঘুড়ি / সৈকত মান্না


                               

           শরীরের ভিতরেও যে কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন হয় সেটা আজকে বুঝল শান্তনু। এতদিন ও কেমিস্ট্রি ল্যাবে  দেখে এসেছে বিভিন্ন বিক্রিয়ায় অ্যাসিড যোগ করলে বিকারের মধ্যে রঙ্গিন তরলটা চড়বড় করে ওঠে আর সাদা গাঢ় ধোঁয়া আশপাশটা ঝাপসা করে দেয়। এই মুহূর্তে ওর বুকের ভিতরটায় ঠিক সেরকমই হচ্ছে, কোন নাম না জানা অ্যাসিড  অলিন্দে-নিলয়ে বিক্রিয়া করে বেড়াচ্ছে আর ধোঁয়াটা বেরবার কোন ফোঁকর না পেয়ে বদ্ধ হৃদপিণ্ডে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। তাই হয়ত বুকটা এত ভারি ভারি লাগছে...পুরনো দগদগে ব্যথাটা ফিরেফিরে আসছে। এখানেও একটা রিঅ্যাক্টর আছে, মানে একটা অণুঘটক যার জন্য বিক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। কি সেটা? কি না, আসলে কে সেটা বলতে হয়। তিথি... তিথি রায় চৌধুরী। ওর জন্যই তো যত যন্ত্রণা শান্তনুর।
সেই শীতের সন্ধ্যাবেলা, তারপর প্রায় পাঁচ মাস পর...শান্তনু আবার তিথির মুখোমুখি হয়েছিল আজ।

          না, আজ তিথি কথা বলেনি যদিও শান্তনুও চায় নি কথা বলতে, উলটে খুব খারাপ অ্যাটিটিউড দেখিয়েছে ও তিথির  প্রতি। তিথির দিকে একবার ও তাকাইনি ও। তিথির সাথে রোহিতও ছিল, আরো কয়েকটা চেনা-অচেনা মুখ ছিল। সামনেই টিচার্স ডে, কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিলো কোন একটা স্যারের জন্য গিফট কিনতে যাচ্ছিলো ওরা সবাই। রাস্তায় একেবারে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেছিল... শান্তনু, রোহিতের সাথে এক নাগাড়ে গেজিয়ে টাইম কাটাচ্ছিল। কথায় কথায় রোহিত জিজ্ঞেস করেছিল, “তা কেমন আছিস বল?” তখন শান্তনু জোর গলায় বলেছিল, “একদম বিন্দাস আছি ভাই।যতক্ষণ কথা বলেছিল সারাটা সময় ধরে এক নাগাড়ে হাতের মোবাইল ফোনটাকে অকারণে ঘেটে গেছিল ও... যেন কাউকে বোঝাতে চাইছে দ্যাখ আমি কত ব্যস্ত। তারপর হঠাৎ করেই আসছিবলে পিছনে ফিরে গটগট  করে হাঁটা দিয়েছিল। মিনিট পাঁচেক পর যখন হাটার গতিটা নিজে থেকে কমে এসেছে তখন বুঝতে পারছে হৃদয়ের ভিতরের রিঅ্যাকশন এর কথা। আর হয়ত তার সিমটমসগুলোই এখন প্রকট হচ্ছে। হাত দুটো  আপনা থেকেই মুঠো পাকিয়ে আছে,কপালে ঘাড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হয়ত এগুলো তাড়াতাড়ি হেঁটে আসার লক্ষণ, তবুও আজ অন্য কিছুর ফলে মনে হচ্ছে। বিকেলের আকাশে কয়েকটা তারা জ্বলজ্বল করছে, ওর মধ্যেই কোন একটা ধ্রুবতারা হবে, যেটা নাকি সব সময় থাকে। তার মানে তো তারাটা সব জানে... সব। সব ঘটনার খুঁটিনাটি ও দেখেছে। শান্তনু ভাবে যদি একবার তারাটার কাছ থেকে ওর গল্পটার একটা সিডি পাওয়া যেত তাহলে খুব ভালো হত। ও আগাপাশতলা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখত, জানত... ঠিক কি হয়েছিল যার জন্য আজ তিথি আর শান্তনু এক কম্পাসের দুই মেরুতে যারা কখনোই কাছাকাছি আসতে পারছে না। হাঁটার গতিটা কমতে কমতে কখন যে ও দাড়িয়েই গেছিল, পেছনের ব্যস্ত সাইকেল আরোহী তার বেল দিয়ে ওকে আবার নাড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। একটু আগে ও তিথিকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, ওর জীবনে কে এলো আর কে গেল তাতে ওর কিছু যায় আসে না। কিন্তু আসলে তো ওটা রাগের কথা। সেই সন্ধেবেলাটার ঠিক পর মুহূর্তেই ও বুঝতে পেরেছিল ওর ঠিক কি হারিয়ে গেছিল আর আজও তা টের পেয়ে আসছে। এই পাঁচ মাসে নিজের মধ্যে একটা আগ্নেয়গিরির আঁচ পেয়েছে শান্তনু, যা মাঝে মাঝেই নিজের উপস্থিতির জানান দেয় সব ছারখার করে দিয়ে।

         ও বটতলাটা পেরিয়ে এলো, শিব মন্দিরটার পাশ ডানদিকে ঢুকলেই ওর বাড়ি। এখন থেকেই দেখতে পেল ছাদের ধার ঘেঁষে মা দাড়িয়ে আছে। মাকে তো বলেই গেছিলাম ফিরতে দেরি হবে তা মা দাড়িয়ে আছে কেন? মা দেখে এই প্রশ্নটাই প্রথম মাথায় এলো শান্তনুর। মাটা না বড্ড চিন্তা করে। আসলে ফ্যামিলির লোকজনের বড্ড স্বপ্ন ওকে নিয়ে। এখন তার জন্যই মাঝে মাঝে খুব ভয় করে ওর... যা সব চলছে, এবারে আদেও হায়ার সেকেন্ডারিটা উতরাতে পারব তো? কদিন তো ভালো করে পড়াই হচ্ছে না। তার ওপর আজ আবার পুরনো ক্ষতয় নতুন করে রক্তক্ষরণ। কে জানে কি হবে? নিজের ভাবনা গুলোর সাথে কথা বলতে বলতে শান্তনু গেট ঠেলে ওদের ছোটখাটো বাড়িটায় ঢুকল। সবে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল কিন্তু মা ডাক দিল আর ও মায়ের কণ্ঠস্বর এর দিকে বাঁক নিল।

    শান্তনুর মা, হেমাঙ্গিনী রায়, একটু যেন চিন্তিত, সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন।
-  তোমায় তো বলেই গেছিলাম মা, একটু দেরি হবে, স্টেশনের দিকে যাব।
-  আরে তোর জন্য না রে। তোর বাবা এখনও আসেনি, আজ তো শনিবার, হাফ ডে... চারটের মধ্যে চলে আসার কথা, কিন্তু দেখ এখন তো প্রায় সাড়ে আঁটটা বাজতে চলল। চিন্তা হয় না বল?”
-   ফোন করনি ?”
-   না তো। একটু দেখ না বাবা
-   আছা আমি ফোন করছি।
      নাম্বার ডায়াল করে ফোন কানে ধরে আছে শান্তনু। ওপাশে রিং হচ্ছে। মা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। শান্তনু কথা বলছে এবার। খুব সংক্ষেপেই সারল। ফোনটা কেটেই মা কে বলল, “বাবা আসছে। পিসির বাড়ি গেছিল, আর ১০-১৫ মিনিট লাগবে।
-    কেন, বলল?”
-    ও সব তুমি বাবা এলে জিজ্ঞাসা করে নিও। আমার এখন কাজ আছে।বলেই শান্তনু ওর ঘরের দিকে হাঁটা দিল। আসলে ও এখন একটু একাকীত্ব চায়। ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। নীল আলোর নাইট ল্যাম্পটা ছাড়া বাকি আলো নিভিয়ে ওর প্রিয় চেয়ারটায় বসে গা এলিয়ে দিল আর চোখ দুটোকে আরাম দিল বন্ধ করে। চোখ বোজার সাথে সাথে হঠাৎ যে কালোটা ধেয়ে আসে সেটা সয়ে এসেছে এবার, বুকের দপদপটা একটু কম, চোখের কল্পনারা ঘুরে বেড়াচ্ছে এলোপাথারি, আবছা আবছা ছবি। একটা হাসি... দুটো টানা টানা চোখ... হালকা লালচে শেডের লিপস্টিকে ঢাকা ঠোঁট... চোখের ওপর উঠে আসা চুল...। ডান হাত দিয়ে চুলগুলোকে শাসন করে কানের পিছনে লুকিয়ে নিল একটা মেয়ে। কে সে? সব টুকরো একসাথে জুড়লে দাড়ায় একজনই। সে এখনও শান্তনুর ভাবনায় ভেসে বেরায়। তিথি......  
CSS Drop Down Menu
আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com- এ মেল করে।