১
শরীরের ভিতরেও যে কেমিক্যাল
রিঅ্যাকশন হয় সেটা আজকে বুঝল শান্তনু। এতদিন ও কেমিস্ট্রি ল্যাবে দেখে এসেছে বিভিন্ন বিক্রিয়ায় অ্যাসিড যোগ করলে
বিকারের মধ্যে রঙ্গিন তরলটা চড়বড় করে ওঠে আর সাদা গাঢ় ধোঁয়া আশপাশটা ঝাপসা করে
দেয়। এই মুহূর্তে ওর বুকের ভিতরটায় ঠিক সেরকমই হচ্ছে, কোন নাম না জানা অ্যাসিড অলিন্দে-নিলয়ে বিক্রিয়া করে বেড়াচ্ছে আর ধোঁয়াটা
বেরবার কোন ফোঁকর না পেয়ে বদ্ধ হৃদপিণ্ডে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। তাই হয়ত বুকটা এত
ভারি ভারি লাগছে...পুরনো দগদগে ব্যথাটা ফিরেফিরে আসছে। এখানেও একটা রিঅ্যাক্টর আছে, মানে একটা অণুঘটক যার জন্য বিক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। কি সেটা? কি না, আসলে কে সেটা বলতে
হয়। তিথি... তিথি রায় চৌধুরী। ওর জন্যই তো যত যন্ত্রণা শান্তনুর।
সেই শীতের সন্ধ্যাবেলা, তারপর প্রায় পাঁচ মাস পর...শান্তনু আবার তিথির মুখোমুখি হয়েছিল
আজ।
না, আজ তিথি কথা বলেনি যদিও শান্তনুও চায় নি কথা বলতে, উলটে খুব খারাপ অ্যাটিটিউড দেখিয়েছে ও তিথির প্রতি। তিথির দিকে একবার ও তাকাইনি ও। তিথির
সাথে রোহিতও ছিল, আরো কয়েকটা
চেনা-অচেনা মুখ ছিল। সামনেই টিচার্স ডে,
কথাবার্তা
শুনে মনে হচ্ছিলো কোন একটা স্যারের জন্য গিফট কিনতে যাচ্ছিলো ওরা সবাই। রাস্তায়
একেবারে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেছিল... শান্তনু,
রোহিতের
সাথে এক নাগাড়ে গেজিয়ে টাইম কাটাচ্ছিল। কথায় কথায় রোহিত জিজ্ঞেস করেছিল, “তা কেমন আছিস বল?”
তখন
শান্তনু জোর গলায় বলেছিল, “একদম বিন্দাস আছি
ভাই।” যতক্ষণ কথা বলেছিল সারাটা সময়
ধরে এক নাগাড়ে হাতের মোবাইল ফোনটাকে অকারণে ঘেটে গেছিল ও... যেন কাউকে বোঝাতে
চাইছে ‘দ্যাখ আমি কত ব্যস্ত’। তারপর হঠাৎ করেই “আসছি” বলে পিছনে ফিরে গটগট
করে হাঁটা দিয়েছিল। মিনিট পাঁচেক পর যখন হাটার গতিটা নিজে থেকে কমে এসেছে
তখন বুঝতে পারছে হৃদয়ের ভিতরের রিঅ্যাকশন এর কথা। আর হয়ত তার সিমটমসগুলোই এখন
প্রকট হচ্ছে। হাত দুটো আপনা থেকেই মুঠো
পাকিয়ে আছে,কপালে ঘাড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম
জমেছে। হয়ত এগুলো তাড়াতাড়ি হেঁটে আসার লক্ষণ,
তবুও আজ
অন্য কিছুর ফলে মনে হচ্ছে। বিকেলের আকাশে কয়েকটা তারা জ্বলজ্বল করছে, ওর মধ্যেই কোন একটা ধ্রুবতারা হবে, যেটা নাকি সব সময় থাকে। তার মানে তো তারাটা সব জানে... সব।
সব ঘটনার খুঁটিনাটি ও দেখেছে। শান্তনু ভাবে যদি একবার তারাটার কাছ থেকে ওর গল্পটার
একটা সিডি পাওয়া যেত তাহলে খুব ভালো হত। ও আগাপাশতলা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখত, জানত... ঠিক কি হয়েছিল যার জন্য আজ তিথি আর শান্তনু এক
কম্পাসের দুই মেরুতে যারা কখনোই কাছাকাছি আসতে পারছে না। হাঁটার গতিটা কমতে কমতে
কখন যে ও দাড়িয়েই গেছিল, পেছনের ব্যস্ত সাইকেল
আরোহী তার বেল দিয়ে ওকে আবার নাড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। একটু আগে ও তিথিকে বোঝাতে
চেয়েছিল যে, ওর জীবনে কে
এলো আর কে গেল তাতে ওর কিছু যায় আসে না। কিন্তু আসলে তো ওটা রাগের কথা। সেই
সন্ধেবেলাটার ঠিক পর মুহূর্তেই ও বুঝতে পেরেছিল ওর ঠিক কি হারিয়ে গেছিল আর আজও তা
টের পেয়ে আসছে। এই পাঁচ মাসে নিজের মধ্যে একটা আগ্নেয়গিরির আঁচ পেয়েছে শান্তনু, যা মাঝে মাঝেই নিজের উপস্থিতির জানান দেয় সব ছারখার করে
দিয়ে।
ও বটতলাটা পেরিয়ে এলো, শিব মন্দিরটার পাশ ডানদিকে ঢুকলেই ওর বাড়ি। এখন থেকেই দেখতে
পেল ছাদের ধার ঘেঁষে মা দাড়িয়ে আছে। মাকে তো বলেই গেছিলাম ফিরতে দেরি হবে তা মা
দাড়িয়ে আছে কেন? মা দেখে এই প্রশ্নটাই
প্রথম মাথায় এলো শান্তনুর। মাটা না বড্ড চিন্তা করে। আসলে ফ্যামিলির লোকজনের বড্ড
স্বপ্ন ওকে নিয়ে। এখন তার জন্যই মাঝে মাঝে খুব ভয় করে ওর... যা সব চলছে, এবারে আদেও হায়ার সেকেন্ডারিটা উতরাতে পারব তো? কদিন তো ভালো করে পড়াই হচ্ছে না। তার ওপর আজ আবার পুরনো
ক্ষতয় নতুন করে রক্তক্ষরণ। কে জানে কি হবে?
নিজের
ভাবনা গুলোর সাথে কথা বলতে বলতে শান্তনু গেট ঠেলে ওদের ছোটখাটো বাড়িটায় ঢুকল। সবে
নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল কিন্তু মা ডাক দিল আর ও মায়ের কণ্ঠস্বর এর দিকে
বাঁক নিল।
শান্তনুর মা, হেমাঙ্গিনী রায়, একটু যেন চিন্তিত, সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন।
- “তোমায় তো বলেই
গেছিলাম মা, একটু দেরি হবে, স্টেশনের দিকে যাব।”
- “ আরে তোর জন্য না রে।
তোর বাবা এখনও আসেনি, আজ তো শনিবার, হাফ ডে... চারটের মধ্যে চলে আসার কথা, কিন্তু দেখ এখন তো প্রায় সাড়ে আঁটটা বাজতে চলল। চিন্তা হয়
না বল?”
- “ফোন করনি ?”
- “ না তো। একটু দেখ না
বাবা”
- “আছা আমি ফোন করছি।”
নাম্বার ডায়াল করে ফোন কানে ধরে আছে
শান্তনু। ওপাশে রিং হচ্ছে। মা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। শান্তনু কথা বলছে এবার। খুব সংক্ষেপেই সারল। ফোনটা কেটেই মা কে বলল,
“বাবা
আসছে। পিসির বাড়ি গেছিল, আর ১০-১৫ মিনিট
লাগবে।”
- “কেন, বলল?”
- “ ও সব তুমি বাবা এলে জিজ্ঞাসা করে নিও। আমার এখন কাজ আছে।” বলেই শান্তনু ওর ঘরের দিকে হাঁটা দিল। আসলে ও এখন
একটু একাকীত্ব চায়। ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। নীল আলোর নাইট ল্যাম্পটা ছাড়া
বাকি আলো নিভিয়ে ওর প্রিয় চেয়ারটায় বসে গা এলিয়ে দিল আর চোখ দুটোকে আরাম দিল বন্ধ করে। চোখ বোজার সাথে
সাথে হঠাৎ যে কালোটা ধেয়ে আসে সেটা সয়ে এসেছে এবার, বুকের দপদপটা একটু কম, চোখের কল্পনারা ঘুরে বেড়াচ্ছে এলোপাথারি, আবছা আবছা ছবি। একটা হাসি... দুটো টানা টানা চোখ...
হালকা লালচে শেডের লিপস্টিকে ঢাকা ঠোঁট... চোখের ওপর উঠে আসা চুল...। ডান হাত দিয়ে
চুলগুলোকে শাসন করে কানের পিছনে লুকিয়ে নিল একটা মেয়ে। কে সে? সব টুকরো একসাথে জুড়লে দাড়ায় একজনই। সে এখনও শান্তনুর
ভাবনায় ভেসে বেরায়। তিথি......
২
“ মা, ও মা, আমার ছাতাটা কোথায়?” তিথির আজ একটু তাড়া আছে আর আজই ও ছাতাটা খুঁজে পাচ্ছে না। কেমন রাগ ধরে যায় বলত। লাল রঙের থ্রি ফোল্ড ছাতাটা মা...ই ওকে গিফট করেছিল। ওটা ওর খুব প্রিয় ছাতা। ছাতাটা প্রায় সবসময়ই ওর ব্যাগে থাকে।আজ কোথায় যে গেল? এ দিকে ঘড়িতে পাঁচটা বাজতেও যায়। অনি ওপাড়ার মুখেই অপেক্ষা করবে বলেছে, তিথির তো ওখানে যেতে ৬-৭ মিনিট লাগবেই। মনে হচ্ছে ছাতার মায়া আজ ত্যাগ করতে হবেই। মা-টাও তেমন হয়েছে, বিকেল হলেই ছাদে উঠে পাশের বাড়ির কাকিমার সাথে জুড়ে বসবে। ব্যাগটা বিছানায় ফেলে তিথি আরও একবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। খুব একটা খারাপ লাগছে না ওকে। অনেক দিন পর লাল সালোয়ারটা পরেছে ও, শুধু লিপস্টিকটা একটু বেশী ডিপ হয়ে গেছে। ওর মনে আছে কেউ একদিন বলেছিল যে, ‘তোকে হালকা লিপস্টিকে ব্যাপক মানায় জানিস।’ তাই হয়ত ন্যাপকিন এর প্রয়োজন পড়লো লিপস্টিকটা ফেড করতে।
- “বিমলদা আসছি, মাকে বলা আছে ফিরতে দেরি হবে।”
বাড়ির কোয়াসিবল গেটটা হঠাৎ একটু বাঁধা
দিচ্ছিল, যেন আজ যেতে বারণ করছে। ব্যাগের কোনটা আটকে গেছিল। তিথি ছাড়িয়ে নিয়ে
এগিয়ে গেল। আস্তে আস্তে পিছনে চলে যাচ্ছে কোয়াসিবল গেট আর সাদা রঙের দোতলা বাড়িটা।
অলিগলি পেরিয়ে পাড়ার রাস্তায় পৌঁছল তিথি। আড়চোখে দেখল ক্লাবের দরজায় হেলান দিয়ে
কমল বলে ছেলেটা ওকে হা করে দেখছে... হাতে ধূমায়মান সিগারেট। তিথির বেশ লাগে যখন
আশেপাশের উঠতি বয়সের ছেলেরা ওকে অবাক চোখে দেখে, একটু যেন গর্বও হয়।
ইস,
আকাশটা
ডাকছে। বৃষ্টি হলেই প্রবলেম। ডানদিকে বাঁক নিতেই মেন রাস্তার অন্য প্রান্তে অনিকে
দেখতে পেল তিথি, যথারীতি আজও ও বাইকে
হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে, তিথিকে দেখে হাত
নাড়ল। হাত নাড়ার ধরনটা দেখে তিথি বুঝতে পারল না হাই বলছে না তাড়াতাড়ি আসতে বলছে।
যাই হোক ওপাড়ে গেলেই সেটা বুঝতে পারবে,
তার আগে
রাস্তাটা মন দিয়ে পার হতে হবে ওকে। এই রাস্তা পার হতে বড্ড ভয় পায় ও, এই নিয়ে অবশ্য বন্ধুরা কম খ্যাপায় না। শুধু একজন ওকে অনেক
করে শেখাতে চেয়েছিল, কিছুটা হয়ত পেরেছে
আবার কিছুটা হয়ত বাকিও থেকে গেছে। একটু এগিয়ে একটা লোকের পাশে পাশে সাদাকালো দাগ
মাড়িয়ে অনির্বাণের কাছে গেল তিথি।
- “ওঃ !!! আজকে কি লাগছে
তোমাকে, একদম ডানা কাটা পরী, বাইকটা লাগবে নাকি উড়েই চলে যাবে।”
- “ ইয়ার্কি মেরো না তো, কোথায় যাবে তা বোলো?
তোমার
জন্য কিন্তু আজ পড়া কামাই করেছি সন্ধ্যেটা যেন মাটি না হয়।”
- “ আচ্ছা, তাই নাকি? জানতাম না তো পড়াটা
এত ইম্পরট্যান্ট।”
- “ ধ্যাত! আবার ইয়ার্কি? চলো।”
![]() |
| দূরে কালো মেঘের সীমান্ত চোখে আসছে... |
- “ টিকিট পকেটে, চলো।”
- “ হ্যাঁ, চলো।”
অনি আর তিথি পাশাপাশি হেঁটে
সিনেমা হলের চওড়া গেট পেরিয়ে গেল। অনি তিথির বড্ড গা ঘেঁষে ছিল, তাই ঠিক বোঝা গেল না ওরা কি একে ওপরের হাত ধরে ছিল?
তিথি বাড়ী ঢুকেছে ১০-১৫ মিনিট হয়ে গেল।
এখন ওর ঘরের দরজা বন্ধ। ফোনটা সুইচ অফ করে দিয়েছে ও। মনটা যেন একটু অস্থির, নিশ্বাসের সাথে ফোঁসফোঁসানি একটা রাগও ওঠানামা করছে শরীরে।
ফোন অফ করার আগে পর্যন্ত অনি প্রায় ৭-৮ টা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে, “ অ্যাই এম এক্সত্রিমলি সরি” লিখে। আচ্ছা বারবার সরি বললেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? ও আজ যেটা করেছে সেটা কি এতটাই ছোট মাপের? ওটা স্রেফ অসভ্যতামো। তিথি তো অনিকে সেরকম কোন অধিকার দেয়নি
যেটা অনি আজ করতে চেয়েছিল। সিনেমা হলে ঢুকে ও আজ তিথির সাথে অসভ্যতামো করেছে, আজ মাল্টিপ্লেক্স এর আলো-আঁধারে অনি তিথির সাথে যে খেলা
খেলতে চেয়েছিল সেটা ভাবতেও তিথির খারাপ লাগছে। প্রথমে ভেবেছিল অনি বোধহয় অন্যদিনগুলোর
মতই ফাজলামো করছে বাট হি ক্রস হিস লিমিট। রাগের মাথায় তিথি ইন্টারভেলের কিছুক্ষণ
পরেই হল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল। তার আগে পুরো ইন্টারভেল ধরে কথা কাটাকাটি করেছিল
দুজনে। শেষ যে কথাটা তিথি অনিকে বলেছিল সেটা এখনও মাথায় বাজছে ওর। তিথি বলেছিল, “ অ্যাই এম নট চিপ অ্যাস ইউ।”
হল থেকে রাস্তায় নেমে ও সোজা পথে না এসে
অনেক অলি গলি ধরে বাড়ী ফিরেছে, ইচ্ছা করেই যাতে অনি
ওকে খুঁজে না পায়। অনির কথা এখন মাথায় না আনাই ভাল। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।
- “ কি রে খেতে দিয়েছি তো, কটা বাজে খেয়াল আছে?”
- “ হ্যাঁ মা, যাই।”
তিথি বিছানা
ছেড়ে উঠে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। ছাড়া জিন্সটা হাঁটুর তলা থেকে পুরো ভিজে, ওটাকে দরজার মাথায় ঝুলিয়ে দিল। আজ বৃষ্টিটা শেষ পর্যন্ত ওকে
ভেজাতে পারেনি,সিনেমা হল ওকে বাঁচিয়ে
দিয়েছে... শুধু নোংরা জমা জল পা দুটোকে ধুয়ে দিয়েছে।
(ক্রমশঃ)
(ক্রমশঃ)



.jpg)
প্রথম অংশটুকু দারুন লাগলো, পরবর্তী অংশের জন্য অপেক্ষায় রইলাম...
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। :)
মুছুন