আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com-এ। ভালো থাকুন সকলে। চলতে থাকুক কলম। বলতে থাকুক শব্দ।

প্রচ্ছদ

A SAHITYA-ADDA Initiative C/O:sahitya A BLOG MAGAZIN STAY WITH US THANK YOU
bloggerblogger

শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৪

ধারাবাহিক-উপন্যাসঃ এক আকাশের ঘুড়ি / সৈকত মান্না



                                                ৭
               “এই সানু আজ বিকেলে প্র্যাকটিসে আসবি। সাড়ে তিনটেয় স্টেডিয়ামে।”
শান্তনু কলতলায় দারিয়ে ব্রাশ করছিল। অরিত্রর গলা শুনে পায়ে পায়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়ালো। অরিত্র সাইকেল নিয়ে এসেছে, ওর ওপর থেকেই বলল, “ কি রে কুম্ভকর্ণ! এখন উঠছিস? সকালের প্র্যাকটিসটা তো মিস করলি।”
মুখের থুতুটা সাবধানে গলির ড্রেনে ফেলে শান্তনু এবার মুখ খুলল, “শালা আমার আবার কীসের প্র্যাকটিস? প্র্যাকটিসের নামে তো তোরা তাস পেটাস।”
“ইসস! সক্কাল সক্কাল মুখে কটু ভাষা তোকে মানায় না।
“যা  ভাগ, বাড়ী যা তো।
“হ্যাঁ যাচ্ছি। তুই আসিস কিন্তু ভাই, আমার পার্সোনাল দরকার আছে। প্লিজ ইয়ার।
আচ্ছা যাব।
অরিত্র সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল, আর শান্তনুকে পেছনে ফেলে ক্রমশ ক্ষুদ্র হতে হতে মিলিয়ে গেল বাঁকের আড়ালে। মুখ ধুয়ে কলঘর থেকে নিজের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সকালের চায়ের ফরমাইশটা মায়ের উদ্দেশ্যে রান্না ঘরের দিকে ভাসিয়ে দিয়ে এলো ও। আজ ওকে একটু পড়তে বসতেই হবে, ক্যালকুলাসটা ঠিক মত আয়ত্ত হল না এখনও, অঙ্ক টিউটর কথা শোনাচ্ছে এই নিয়ে। অঙ্কগুলো নিয়ে বসল শানু, কেনি যে এই ১৭ নং অঙ্কটার উত্তর মিলছে না, পরশু ঠিক এখানে এসেই আটকে গেছিল। মা টেবিলে চা রেখে গেছে কাপ থেকে পাক খেয়ে ধোঁয়া উঠছে।  গরম চাটা বড্ড টানছে। হাত বাড়াল শানু। কিন্তু অঙ্কটা...

     “এই ওঠ, ওঠ না বাবা, দ্যাখ কখন থেকে তোর ফোনটা বাজচ্ছে।” ঝাপসা চোখে মাকে দেখতে পেল সানু। মুহূর্তে ফিরে এলো বর্তমানে। ইসস... আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ ঘষতে ঘষতে মায়ের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে দেখল একটা আননোন নাম্বার। সাতপাঁচ না ভেবে, রিসিভ করল। একটা মিষ্টি কণ্ঠ গরগরিয়ে বলে চলল, “নমস্কার, আমি সুতপা, টাটা ডোকোমো শুধুমাত্র আপনার জন্য নিয়ে এসেছে...” বাকিটা শোনার আগেই শান্তনু কুটুস করে ফোনটা কেটে দিল। বিরক্তিকর লাগে এগুলো। হেমাঙ্গিনী ততক্ষণে নিজের কাজে ফিরে গেছেন। ঘড়ির কাটা, ১২ টা ছুঁই ছুঁই। ইসস কি যেন এক ঘুম হয়েছে ওর, সময়জ্ঞান হীন। হাত পা ঝেড়ে উঠে পড়ল, স্নানটা এবার করে নেওয়া উচিৎ। গামছা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে ঢোকার আগে আর চোখে দেখে নিল মা তখনও রান্নাঘরে। যাক।
শাওয়ারটা খুলে দুটো হাত পেতে দিল বৃষ্টি মাখার মত করে। আসলে একে বারে তলায় এসে দাড়াতে ভয় লাগে ওর। ফোঁটাগুলো ভয় দেখায়। কিন্তু এই মিথ্যে বৃষ্টিটাই ওর বড় প্রিয় সময়। আস্তে আস্তে সরে এসে দাঁড়ালো। চোখ বুজে এলো প্রতিবর্তে। ভাললাগে। এই সময়টা ওকে ঠাণ্ডা স্মৃতি দেয়, ও মুচকি মুচকি হাসে। হাসবেই তো। তিথির ওরকম মুখ বেঁকানো দেখলে যে কেউ হেসে ফেলবে। তিথির সাথে তখন শান্তনুর সর্বক্ষণ কথা হয়। মাধ্যম এস এম এস। ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমতে যাওয়া তক। তিথি কখন উঠলো, কখন খেল, কি খেল, কখন স্কুলে বেরল, বাস পেল কিনা, বসার জায়গা পেল কিনা, প্রেয়ার লাইনে দেরি করে পৌঁছেও কি করে বকার হাত থেকে বাঁচল, টিফিনে কি করল, কোন ম্যামের ক্লাসটা বোরিং, আর ফেরার পথে রাস্তার কোন ছেলেটা ওকে লাইন মারল সব। তেমনি সানুর সব খবর তিথিও  জানত। এত কথার বেশির ভাগটা যদিও তিথিই সঞ্চালনা করত। শান্তনুর ছিল একটাই কাজ, সায় দিয়ে যাওয়া আর সাথে খুব করে তিথির পিছনে লাগা। খুব মজা পেতো এমনটা করে। রিতিমত খাউমাউ করে উঠত তিথি। শান্তনু তো হেসে লুটোপুটি খেত। মাঝে শান্তনু তিথিকে পেঁচি বলে ডাকত, অনলি এস এম এসে। একদিন বিনয় স্যারের ব্যাচে বসে
পেঁচি লিখে পাঠিয়েছিল ও। সেদিন তারপর থেকে যতবার শান্তনু তিথির দিকে তাকিয়েছিল ততবার তিথি অদ্ভুত ভাবে মুখ বেঁকিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এসবই মনে করতে করতে ভিজে যায় ও।

               ও যখন স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে ঢুকল সূর্য তখন পশ্চিমে সামান্য ঘাড় হেলিয়েছে। এখনো ঘণ্টাখানেক রোদ হল্কা আনবে হাওয়াতে। ও আর অরিত্র এখন মাঠের ধারে একটা হেলান তেঁতুলগাছের নীচে বসে আছে। কিছুটা দূরেই অভিষেক, তমাল আর রোহিত একটা ত্রিভুজ করে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করছে। দেখতে দেখতে বাকিরাও চলে আসবে। সানু আকাশ দেখছে। চোখের ওপরে ভেসে থাকা ধুলো গুলো স্পষ্ট হচ্ছে মাঝে মাঝে। কষ্ট করে তাকিয়ে থাকতে হয়। সানুর কেন যেন মনে হয় এমনটা করলে চোখ ভালো থাকে। কি জানি কেন মনে হয়।

“আব্বে, ওয় চাতক পাখির বাচ্চা। যেটা বলছি শুনছিস কি?”  
“যা বাব্বা, তুই আবার কখন কি বললি?”
“না মানে, শোন সেটাই তো বলছি। ”
“বল শুনি।”
“বলছি, আগে তুই বল, ক্রিকেট খেলাটাকে নিয়ে তুই কি ভাবছিস?”
“অ্যাঁয়!! কি আবার ভাববো? আমি কি জগমোহন ডালমিয়া নাকি যে ভাববো।’’
“ধুর! ধুর! গবেট, আমি বলছি তোর নিজের ক্রিকেট খেলাটাকে নিয়ে কি ভাবছিস? আচ্ছা আগে শুনেই নে দেন ভাবতে সুবিধা হবে। তুই জানিসই তো ক্রিকেটটাকে আমি কতটা ভালবাসি। মনে প্রানে ক্রিকেট খেলতে চাই কিন্তু এই ভালোবাসাটা একদম ছোট্টবেলা থেকে নয়। শেষ দু-তিন বছর, কিন্তু আমি সিরিয়াসলি খেলতে চাই। বাড়িতে বলেছিলাম, কোচিং ক্লাবে ভর্তি হব। বাবা ব্যাগরা দিলো।’’
“দিলো তো দিলো, তুই কি এখন তোর শোকগাথা শোনাবি ভাবছিস আমায়?”
“কুত্তা, খিস্তি খাবি কিন্তু এবারে, পুরোটা শোন। সো যাই হোক, আমি তারপর হোপ ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু গত সপ্তাহে একটা খবর পেলাম। সেটা হল নাইকের সাথে চুক্তি করে টাটা গোষ্ঠী সারা ইন্ডিয়া থেকে কয়েকজন আন্ডার এইটটিন ক্রিকেটার বাছবে, যারা কিছু বাছাই করা ফাস্ট ডিভিশন ক্লাবে ইয়াংস্টার হিসাবে দু বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হবে। আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বা আমার ইন্টারেস্টের জায়গা কোনটা জানিস?”
সানু সাথে সাথেই বলে উঠলো, “কোনটা?”
“এইখানে যে কেউ ট্রায়ালদিতে পারবে।”
“যে কেউ মানে?
“যে কেউ মানে যে কেউ। কোন অ্যাকাডেমি বা স্কুল টিম, এসব কিছু লাগবে না। আমি পুরো রিসার্চ করেছি। খালি বয়স আঠারোর নীচে তার প্রুফ চাই। ট্রায়াল হবে, রবীন্দ্র সরোবরে। বি এন সিং একাডেমীর মাঠে। আগামী রবিবার সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত। কলকাতার তিনটে ফাস্ট ডিভিশন ক্লাব থাকবে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের মোট চারটে ক্লাব চুক্তিবদ্ধ তার মধ্যে তিনটেই কলকাতার, মানে এখানথেকেই ১২ জন চান্স পাবে অথবা সংখ্যাটা ১৫ ও হতে পারে।”
কিছুটা বিস্ময় নিয়ে শুনছিল বটে সানু, কিন্তু হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু এসব আমায় বলছিস কেন বলত?”
“একটা ঢোঁক গিলে অরিত্র বলল, ভাবছি একটা চান্স নেব। কিন্তু একা না ঠিক সাহস পাচ্ছি না। তুই যাবি রে ত্রায়ালে?”
“আমি!! আমি কি করে যাব?”
“কেন তুই ও তো ভালো খেলিস। আগের দিনই তো ফাটিয়ে বল করলি।”
“ধুর! সেতো অনেকেই করে। তা বলে ফাস্ট ডিভিশন?”
“নয়ই বা কেন?  তুই কি করে জানলি তুই ফাস্ট ডিভিশন খেলার যোগ্য কিনা? আর তোকে ফাস্ট ডিভিশন খেলতেও হবে না। ভাই দু বছরের চুক্তি। ওরা তোকে ট্রেনিং দেবে, তৈরি করবে। আর তোর মধ্যে পটেনশিয়াল আছে। আর আমি নিজেকেও একটা চান্স দিয়ে দেখতে চাই। যদি লেগে যায়। প্লিজ ভাই চল না। আর পুরোটাইতো ফ্রীতে”
সানু পরিপ্রেক্ষিতে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বলল না। অরিত্রর আর্জিটা যুক্তিসঙ্গত মনে হল। কিন্তু ক্রিকেট খেলবে সানু? কোনদিনই তো এসব ভেবে দেখেনি। আর পাঁচটা ছেলের মতইও খেলতে ভালোবাসে। এর থেকে এগিয়ে ভাবা হয় নি। কিন্তু অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “দাড়া, আমি একটু ভেবে দেখি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে তমালের গলা শুনতে পেল ওরা। ও চীৎকার করে বলছে। সানু বলটা দে। নীচে তাকিয়ে দেখল ওর পায়ের থেকে এক হাত দূরে সবুজ একটা ডিউস তাকিয়ে আছে ওর দিকে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

CSS Drop Down Menu
আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com- এ মেল করে।