জেগে উঠছিল লছমী। ধীরে ধীরে ওর হুঁশ ফিরে আসছিল। তা হলে কি সে মরেনি ?
বেঁচে থাকার একটা ধারাবাহিকতা আছে। খাওয়া পড়া ঠিকঠাক থাকলে নিজেকে ছেড়ে দাও, আপনি আপনি বেড়ে ওঠার প্রবণতা কাজ করে যায়। মাঝখানে একটা দুটো মশা মাছি ঠাস ঠুস চাঁটিয়ে মারতে হয় এটাও ঠিক।
বিষও তার কাজ হারিয়েছে। তা হলে কি সেখানেও ভেজাল এসে গেছে ! যেখানে যতটুকু বিষ কাজে আসার কথা তার চেও অনেক বেশী বিষ মিশলে তবেই কি মানুষের মৃত্যু ঘটবে !
লছমী তো চেয়েছিল মরতে। যে ওষুধের একটি বড়ি মানুষকে ঘুম নেশা এনে দেয় তার দশটা বড়ি নিয়েছিল--এক ঘটি জল নিয়ে ঢক ঢক করে সে দশ দশটা ঘুমের বড়ি আত্মসাৎ করেছিল কিন্তু কোথায়--মৃত্যু কোথায় ?
লছমী দেখতে শুনতে ভাল। কালোর মাঝে কোথাও চকচক একটা ভাব প্রলেপ লেগে আছে শরীরে। রাধিকা তো শ্যাম বর্ণা ছিল। আর গোপিনীরা ? রাধিকার না হলেও গোপিনীর চেহারা ছিল লছমীর। সর্ব নারীদের মানসিক গঠন প্রায় এক রকম বলা চলে। পরিবর্তনগুলির রকমফের যতটা তাদের মাঝে ধরা পড়ে তার বেশীর ভাগটাই পরিবেশ পরিস্থিতির লালন পালনে ঘটে।
লছমী বস্তির মেয়ে। দিন আনা দিন খাওয়া বাপ মার মেয়ে। বাপ তার ক বছর আগেই মরে গেছে। এখন মা, ছোট ভাই আর লছমী আছে।
লছমীর মাকে পেটের জন্যে দিনরাত কাজ করতে হয়। তিন ঘরে ঠিকে ঝির কাজ করে। বাবা মারা যাবার পরে পড়ালেখা ছেড়ে লছমীকেও কাজে ভিড়তে হয়েছে। নিজের তো কিছু হল না, ভাইকে যদি সামান্য শিক্ষিতের স্তরে তোলা যায়। গরীবের ছোট ছোট স্বপ্ন থাকে। গরীব বড়লোকের সবারই ওপরে ওঠার স্বপ্ন থাকে--গরীবের ধীর গতির স্বপ্ন আর বড়লোকের বিরাট আকাশ প্রাসাদ স্বপ্ন ! তবু স্বপ্ন তো মানুষ মাত্রই দেখে !
স্বভাব চরিত্তির নিয়ে প্রথমে লছমীর গর্ব ছিল মনে মনে। ইতিমধ্যে মন্টুকে সে রঙিন চোখে দেখতে লেগেছে। শত হলেও মন্টু পয়সা ওয়ালা ঘরের ছেলে আর সবচে বড় কথা লছমীর চোখে ও খুব ভাল ছেলে। তাই বোধহয় লছমী তার জীবনের প্রথম আসা নবুকে অবহেলা করে চলছিল। তার ভালবাসাকে সে ফিরিয়ে দিতে চেয়ে ছিল।
জীবনের প্রথম ভালবাসার পাত্র--নবু। লছমীর মনে হয়েছিল মন্টুর তুলনায় নবু অনেক নিকৃষ্ট--বস্তির সমস্ত ভাব ভাবনার হীনমন্যতা নবুর চলন বলনে রয়েছে। তাই নবুর সততা পরীক্ষায় নেমে ছিল লছমী--জীবন নিয়ে খেলা করার মত নবুকে নিয়ে সে খেলেছে। তাতে হিংস্রতা না থাকলেও লছমীর প্রশ্রয় ছিল। ইচ্ছে হয়ে ছিলি নবুর চরিত্তির পরীক্ষা করে দেখার!
--নবু তুই যে ভাল ছেইলে তা কেমনে বুঝুম রে ?
নবু হেসে বলেছিল,পরীক্ষা কইরে দেখ তা হইলে।
তখন লছমী সত্যি যে পরীক্ষায় নামবে নবু তা কি করে জানবে ! সে ছিল ভীষণ এক পরীক্ষা। নবুকে সে যে পুরুষালী অগ্নি পরীক্ষায় নামিয়ে ছিল ! শেষে নবু হেরে গিয়ে ছিল ও গলে গিয়ে ছিল--আগুনের কাছে ঘি হয়ে গলে গিয়ে ছিল।
রাতের খাওয়া সেরে শীতের কাঁথার তলে শুয়ে ছিল লছমী। নবু মাঝে মাঝে এমনি সময় আসে। সে দিনও নবু এলো। লছমী সহজতর এক পরীক্ষার প্রয়োগের কথা মনে করে নিলো, খুব মোলায়েম ভাবে সে বলে উঠলো, নবু, আয় শুইবি আমার লগে ?
এ কি কয় লছমী ! নবু বড় আশ্চর্য হয়ে ছিল।
--না রে, আয় না--তুই তো আমারে ভালবাসিস, তা হইলে পারি না আমারা এক লগে বিছানায় শুইতে ? তুই, আমি তো কয় দিন পরেঐ বিয়া করুম !
লছমীর মা আর ভাই তখন ঘুমে আচ্ছন্ন।
ইতস্তত করতে করতে শেষে নবু লছমীর ভালবাসার পরীক্ষার ফাঁদে পা বাড়াল। ধীরে ধীরে লছমীর পাশটিতে গিয়ে বসলো। লছমী নবুর হাতে হাত রাখল, নবু গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ল লছমীর পাশে। লছমী নবুকে কাঁথার নিচে ঢেকে নিলো।
উষ্ণ গরমে ধীরে ধীরে সংযম ক্ষয়ে যাচ্ছিল নবুর। লছমীর ধূমায়িত দেহে কি এক সময় আগুন জ্বলে উঠছিল ! নবুর মনে হচ্ছিল, আর সে নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না। ও গলতে শুরু করেছিল। লছমী দেখল তার অন্তর বস্ত্র ভিজে উঠছে--লজ্জা স্থান ছুঁতে চলেছে সে অগ্নিদাব !
লছমী ছিটকে সরে গেল দূরে। শয্যা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। নবুর দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বলে উঠলো,ছি ! ছি ! বিয়ের অপেক্ষাটুকু কইরতে পারলি না নবু ! তরে আমি ঘৃণা করি --যা তুই,বায়রুইয়া যা এহান থে!
নবুর অপরাধ বোধ তাকে মাথা নত করে রাখল--ধীর পায়ে সে ফিরে গেল আপন ডেরায়।
নবুকে লছমী ফিরিয়ে দিয়ে ছিল--তবে কি সে মনে মনে মন্টুকে ভাল বেসে ফেলেছিল ? তা না হলে নবুর প্রতি এত অবহেলা ওর মনে কি করে জন্ম নিয়ে ছিল?
মন্টুকে দেখলে বড় নিরীহ সাদাসিধা লাগত লছমীর। কি কারণে মাঝে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে ছিল সে--এবার প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবে। দিনভর ও ঘরেই বসে থাকত--মুখ গুঁজে বই নিয়ে পড়ে থাকত, আর তারই মাঝে চুরি করে লছমীর দিকে তাকাত। রাতে নাকি ঘোরা ফেরা করত কিছু বন্ধুদের সাথে। তাতে কি ! ছেলেরা সারাদিন কি ঘরে মুখ গুঁজে বসে থাকতে পারে !
লছমী মন্টুদের বাড়িতে কাজ করত। মন্টুরা বড়লোক না হলেও, উচ্চমধ্য বিত্তের তো বটেই। লছমীর কাজ ছিল দু বেলা এসে রান্নাবান্না করে দিয়ে যাওয়া।
লছমী লক্ষ্য করত সুযোগ পেলেই মন্টু লছমীর সঙ্গে কথা বলতে চাইতো। লছমীর ভাল লাগত মন্টুকে কিন্তু সে জানে ওদের মাঝে অনেক ফারাক--বস্তি আর প্রাসাদ এ দুটো জাগা কোন দিন এক জাগায় মিশতে পারবে কি ? তবু ভাললাগে--ভালোলাগা নাকি অন্ধ--ভালবাসার প্রথম স্তর!
এক দিন আড়ালে মন্টু লছমীর হাত ছুঁয়ে ছিল। এটা আর দোষের কি ? মন্টু লছমীর মনে সুন্দর এক অনুভূতি ধরে রেখে ছিল। এক দিন নিভৃতে চুপ করে মন্টু বলে ছিল, লছমী, তোকে আমি খুব ভালবাসি রে !
লছমীও নিজের মনের গভীরে মন্টুর ভালবাসা অনুভব করেছিল। তাই ত সে নবুকে আর বেশী গভীরে ঘেঁষতে দেবার সুযোগ দেয় নি !
ব্যাস ওই পর্যন্ত। এক দিন ঘটে গেলে সেই দুর্ঘটনা। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। লছমী ঘর থেকে ঘুরে এসে রাতের রান্না সারবে বলে মন্টুদের ঘরে ঢুকল। কিন্তু ঘরের লোকজন কোথায় ! একা মন্টু আর তার দুই দোস্ত পড়ার ঘরে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত।
লছমী রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। রান্নার শব্দে আশপাশের কোন শব্দই তার কানে যাচ্ছিল না। একবার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন লছমীকে ডাকল। তাকাল ও--মন্টু ডাকছে তাকে--হাতছানি দিয়ে। গ্যাসের আগুন কমিয়ে ও রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
--কিছু কইবা তুমি ? লছমী নম্রস্বরে বলেছিল।
মন্টু অনেকটা আপন হয়ে বলে উঠেছিল, আয়না আমার ঘরে !
--কেন্ ?
--বন্ধুরা তোকে দেখবে।
না, না, আমি যাইতে পারমু না, লজ্জা নিয়ে বলে উঠেছিল লছমী।
তবু মন্টু লছমীর হাত ধরে বারবার আবদার করে ছিল।
--ঠিক আছে, রান্না নামাইয়া আসছি।
রান্না সেরে লছমী মন্টুর ঘরে উঁকি মারল। কিন্তু ও কি, ওরা নেশা করছে নাকি ! মদের বোতল, গ্লাস সবই তো ওদের সামনে রাখা! এখন কি করবে লছমী?
মন্টু দেখে নিলো লছমীকে। লছমী, যাই, বলে তাড়াতাড়ি ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে ছিল।
--না, লছমী, আয় না ঘরের ভিতরে একটু--তোকে ওরা একটু দেখবে, জড়ানো গলায় মন্টু কথাগুলি বলতে বলতে ঘরের বাইরে এসে লছমীর পাশে এসে দাঁড়ায়।
--ছি, তুমি মদ গিলতাছ ?
--আয় না রে, বলে মন্টু লছমীর হাত ধরে নিলো।
--না, না, ছাড়ো আমারে--ঘরে যামু--
ততক্ষণে বাকি বন্ধুরা লছমীর পাশে হাজির হয়েছে। ওরা হাসছিল--ওদের চোখগুলি যেন তীক্ষ্ণ জ্বলে উঠে ছিল।
লছমী যেতে পারল না--মন্টু তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। আর বাকি বন্ধুরা ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে দিল। ওরা তিনজন মিলে নির্দয়ের মত তাকে টেনে হিঁচড়ে জবরদস্তি শুইয়ে দিল। লছমীর চীৎকার, চেঁচামেচি সংঘর্ষ ব্যর্থ হল, তাকে লুটিয়ে থাকতে হল বিছানায়। প্রেমের কঠিন ছোঁয়ায় আজ ধর্ষকামে ফুটে উঠলো তার রক্তাক্ত দেহ। নখর পশুর আঁচড়, দাঁতাল শূয়রের দংশনে তখন সে নিঃস্ব !
কোন মতে মাঝ রাতে টলতে টলতে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে ছিল লছমী। রাগে ঘেন্নায় সমস্ত শরীর তার জ্বলছিল। মা তাকে দেখেই বুঝে নিয়ে ছিল,দংশন--বিষাক্ত দংশনের শিকার হয়েছে তার মেয়ে। এর থেকে আর মুক্তি নেই--লছমী মরবে না--তাকে বেঁচে থাকতে হবে। এ বিষ ক্রিয়া জীবন ভর একটু একটু করে ওকে নিস্তেজ করে নেবে।
পুলিশের কাছে যামু, ফুঁসে উঠে ছিল লছমী।
মা তার মুখ চেপে ধরে ছিল, কিচ্ছু হইব নাই রে--আমাগোর বিচার কুথাও নাই !
--না, আমি পুলিশে যাইমু, আবার চাপা চীৎকার করে উঠে ছিল লছমী।
আবার লছমীর মুখ চেপে ধরে তার মা বলেছিল, চুপ! লোকজন জাইনতে পারবো--পুলিশে গিয়া কিচ্ছু হইব না--বরং পুলিশরা তরে ধইরে খাইব--আরও বিষ ডালবো তর শরীলে !
অগত্যা থেমে গিয়ে ছিল লছমী। না খেয়ে শয্যা নিয়েছিলো। দুটো দিন স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। তার মধ্যে সে ঠিক করে নিয়েছিল এ জীবন সে আর রাখবে না। নারীর নাকি নারীত্ব চলে গেলে আর কিছুই থাকে না। ও ধর্ষিতা হল, জীবনের বাকি কি তার থাকলো তাইলে ? সন্ধ্যের পরে ও বেরিয়ে পড়ল, ঘুমের বড়ি কিনে আনল। দোকানদার কিছুতেই দেবে না, লছমী মিথ্যা বলল, ওই রায় বাড়ির গিন্নীমা লইয়া যাইতে কইসে গো ! পুরো এক পাত্তি, মানে দশটা বড়ি নিয়ে এলো। আর রাতে মার জোরাজুরিতে দু গ্রাস ভাত গিলে খেয়ে নিলো সব ঘুমের বড়িগুলি।
নবুর কথা মনে পড়ছিল লছমীর। সেই তো ছিল আসল ইনসান--বুঝতে পারেনি লছমী--আজ সে মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে।
অন্তহীন নক্ষত্রের দেশ ছাড়িয়ে আরও আরও অচিন কোন দেশে পাড়ি দিচ্ছিল লছমী। ছেঁড়া কাঁথার নিচেও অলৌকিক স্বপ্ন ঘোর লেগে ছিল তার ডানায়--চোখের সামনে ক্রমশ তাল তাল জমাট অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছিল। আর কিছু মনে নেই লছমীর।
তারপর খুব আস্তে আস্তে আবার জেগে উঠছিল লছমী। তার আধ ঘুম জাগরণের মাঝে এক উৎকট বমি বমি ভাব পেটের ভিতরে মুচড়ে চলছিলো। ঘুমের ঘোরের মাঝে কয়েকবার বিছানাতে বমি করলো সে। এক সময় বুঝতে পারছিল সে, হুঁশ ফিরেছে তার--তা হলে কি সত্যি ও মরে নি !
লছমীর উঠে বসার ক্ষমতা নেই—এক সময় হঠাৎ চোখে পড়লো, সকালের কুয়াশা ভেঙে একটা জাল শরীর ওর দিকে এগিয়ে আসছে!
--কে ? কে ওখানে ? অস্পষ্ট ক্ষীণ আওয়াজ লছমীর গলা থেকে বেরিয়ে এলো।
নবু ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো লছমীর শিয়রের কাছে।
--আমি চইলে যাচ্চি রে লছমী ! একটা কাজ পেইয়েছি।
কিছু বলল না লছমী--শুধু নবুর দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলো।
--সব জানি রে লছমী--সব জেইনেছি আমি--আমি চইলে যাচ্চি রে!
--কুথায়?
নবু একবার ঢোক গিলে বলে উঠলো, দূরে--অনেক দূরে—একটু থেমে আবার বলল, আমায় খেমা কিরে দিস লছমী !
লছমী ডুকরে কেঁদে ওঠে, বলে ওঠে, আমি খারাপ মাইয়া রে নবু--আমি লস্ট মাইয়া--তোর চে শতগুণ খারাপ আমি রে ! আমারে তুই খেমা করিস নবু!
--না,না,তুই লস্ট না--তর ইতে কি দুষ ক ?
--এখনও তুই আমারে ভালবাসিস নবু ? কান্না চোখে আকুল আগ্রহ ভরে লছমী নবুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে।
নবু কিছু সময় চুপ করে থেকে বলে ওঠে, লছমী, তুই আমার লগে যাবি ?
ভোরের কনকনে ঠাণ্ডা দূরে সরে গিয়ে তখন সকালের রোদ্দুরে নম্রতার ভাপ ঘিরে নিচ্ছিল। বেঁচে থাকার আশা লছমীর শরীরে এঁকে দিচ্ছিল প্রশান্তির রেখা।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন