আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com-এ। ভালো থাকুন সকলে। চলতে থাকুক কলম। বলতে থাকুক শব্দ।

প্রচ্ছদ

A SAHITYA-ADDA Initiative C/O:sahitya A BLOG MAGAZIN STAY WITH US THANK YOU
bloggerblogger

রবিবার, ১৮ মে, ২০১৪

গল্পঃ নির্বাচিত বেদনা / শ্বেতা বণিক

             
                                                           
                                                                                 এক

     বহুদিন পর আজ জানলার বাইরে চোখ রেখেছে সুমন। বহুদিন পর। কতকাল যে ভালো মত আকাশটাকে দেখা হয়নি! দেখার ইচ্ছেটাই যেন মরে গিয়েছিল। কেন গিয়েছিল, কিসের জন্য গিয়েছিল সবটাই এখন অতীত। তবুও ভেতরটা কেমন খচখচ করে। তিনবছর হয়ে গেল! সুমন কিন্তু ভেবেছিল, সুস্হ স্বাভাবিক জীবনে বুঝি আর ফেরা হবে না ওর। হুইলচেয়ার দিয়ে যে নতুন জীবনটা শুরু হয়েছিল, সেভাবেই কেটে যাবে। অথচ, সুমনকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে হুইলচেয়ার তার বন্ধুত্ব অস্বীকার করেছে মাস আষ্টেক আগে। এখন ক্রাচ নিয়ে হাটতে পারে সুমন। কষ্ট হয় খুব, তবু নিজের পায়ে দাঁড়াতে তো পারে। জীবনটাও আস্তে আস্তে পাল্টাচ্ছে এবং খুব আশ্চর্যের বিষয়, আজ এতদিন পর আবার চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাতে ইচ্ছে হয়েছে। কারণটা কি? বৃষ্টি? এরকম আকাশভাঙা বৃষ্টি শেষ কবে দেখেছিল, মনে করতে পারল না। ঝিনুকের সাথে সেই যে ছাদে দাঁড়িয়ে ভিজেছিল, সেদিনের পর বোধহয় এই আজকে। এরকমই মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছিল সেদিনও। এরকমই? নাকি বৃষ্টি দেখলেই ঐ দিনটার সাথে মিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে? সপসপে গায়ে ঝিনুকের শরীরের বিপজ্জনক বাঁকগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। নিজেকে ধনুকের মতো বেঁকিয়ে দিয়েছিল, ছাদের রেলিঙে। নীচে পড়ে যাবে ভয়ে জাপটে ধরেছিল সুমন। ঝিনুকের সেকি খিলখিল হাসি, “ভয় পেলি?” এক ঝটকায় ওকে বুকে টেনে নিয়েছিল সুমন, “আমি তোকে খুব ভালোবাসি রে ঝিনুক। খুব…খুব…খুব…………”
জানলা থেকে চোখটা সড়িয়ে নিল সুমন। কাঁটাটা এখনো বুকে বিঁধে আছে। থেকে থেকেই রক্তক্ষরণ হয়। ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে কই? এখনো ঐ নামটা সবসময় চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করে। ঝিনুক মিত্র। ঝিনুক মিত্র। ঝিনুক মিত্র।
“সার, চা।“
চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল সুমনের। দরজার দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল, ঝন্টু পেয়ালা হাতে দাড়িয়ে আছে। এ’কান থেকে ও‘কান পর্যন্ত একটা হাসি ঝোলানো। সবসময় এরকম একটা ইলাস্টিক হাসি দিয়ে মুখটা ঢেকে রাখে ঝন্টু। মাঝে মাঝে বড় বিরক্তি লাগে সুমনের। অথচ মন চাইলেও মুখ ফুটে বারণ করতে পারে না। এই পৃথিবীতে কেউ তো আছে, যার মুখে এখনো হাসি ফোঁটে সুমনের জন্য। হোক না কৃত্রিম! এটাই বা কম কি? এই তিনবছর ধরে ঝন্টুই তো সুমনের একমাত্র সঙ্গী। অর্থের বিনিময়ে বেগার খাটা ছাড়াও যেন একটা টান কাজ করে ওর মধ্যে। ঠিক মনিব-ভৃত্যসুলভ নয়। দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা যেন। কেন? ঝন্টুও ভীষণভাবে একা বলেই কি?
“সার, একশোটা টাকা দ্যান। হাত বাড়ালো ঝন্টু।”
“কি করবি? সুমন অনেকটাই অবাক। কালই না ঝন্টু দু’শো টাকা নিল, বাজার খরচের জন্য! আজ আবার টাকা কিসের? ব্যাটা পয়সা ঝারতে শুরু করেছে নাকি আজকাল?”
“গোবিন্দভোগ সাইল, কাজু, কিসমিস, খোয়া ক্ষীর আনতে হইবে। কবে ফুরাইসে খেয়াল করি নাই। এখনই দ্যাখলাম।”
“ওসব দিয়ে কি হবে? কিচ্ছু লাগবে না। ঘরে যা আছে তাই দিয়ে চালিয়ে নে।”
ভীষণ অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ঝন্টু। খানিকটা ভর্ৎসনাও কি উঁকি দিচ্ছে?
“আপনি ভুইল্যা গেসেন সার? আইজ না ম্যাডামের জন্মদিন!”
কে যেন সজোড়ে একটা চড় কষালো সুমনের গালে! আজ জুলাই মাসের চার তারিখ। ঝিনুকের জন্মদিন। কি করে ভুলে গেল সে? তিনবছর আগেও প্রতিবার ঝিনুক দিনটা কাটাতো সুমনের সঙ্গে। আড়ালে পায়েসের বাটির প্রথম চামচটা তুলে ধরতো ওরই মুখের সামনে। সুমনও সবার অলক্ষ্যে চুম্বন এঁকে দিত ঝিনুকের ঠোঁটে। বছর গুনে গুনে হিসেব করে। এতটা আবেগ, এতটা অনুভূতি, সব কি তবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত? মাত্র তিনটে বছরে? মৃত্যু কি তাহলে এতটাই কঠিন? কল্পনার অস্তিত্বটুকুও কেড়ে নেয় আস্তে আস্তে? নাহ্… কোথায়? এই তো বৃষ্টি দেখে ছিঁড়ে যাচ্ছিল ভেতরটা……হঠাৎই আবারও মস্তিষ্কে বিদ্যুৎপ্রবাহ হল যেন! কার কথা ভাবছিল সে? ঝিনুক মিত্র? এ তো তার ঝিনুক নয়! অথচ প্রতিটা স্মৃতি তো সেই ঝিনুকেরই। সুমনের ঝিনুক। যার জন্য একদিন যদু মিত্র লেনের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল সুমন। এখনো তারা সুমনকে মৃত হিসেবেই স্বীকার করে। তাহলে আজ কি হল? এতদিন তো কোন দ্বিধা ছিল না। তবে আজ কেন অবচেতন মনে এক হয়ে যাচ্ছে দুই ঝিনুক? কেন?
“সার, টাকা দ্যান। ফিরত আইসা রান্না বসাইতে লাগবে। দেরী হইলে আপনারই ক্ষতি।”
“মানিব্যাগ থেকে নিয়ে যা। এখনো ধাতস্হ হয়নি সুমন। চিন্তা-শক্তি চরমে না পৌছলে বুঝি হবেও না। বারবার ঘুরে ফিরে আসবে ভাবনারা। একবার, দু’বার, তিনবার…………।”
ঝন্টু টাকাটা নিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎই থেমে দাঁড়িয়েছে সুমনের সামনে। একদৃষ্টিতে কি যেন খুঁজছে সুমনের অবয়বে। তারপর আবারও মুখ ভরে গেছে সেই হাসিতে,
“সার, মনের তল পাওয়া ভার। কেউ কখনো পায় নাই। অযথা ভাইবেন না। সবকিসুর মানে থাকে না।”
সুমন ঝন্টুর বেড়িয়ে যাওয়াটা দেখছিল। আশ্চর্য! এবার কিন্তু ঝন্টুর মুখের হাসিটা আর ইলাস্টিক বলে মনে হল না। মনে হল, ঝন্টু অনেক কিছু জানে, বোঝে। সুমনের থেকেও বেশী? হ্যাঁ, অনেকটাই বেশী।


                                                                            দুই

      নিজের চেয়ারে বসেও বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে সুমন। তিনবছরের চেনা তালটা কোথায় যেন কেটে গেছে। কাজেও মনটা বসাতে পারছে না একদম। ভেবেছিল আজকে বাড়িতেই থাকবে। কিন্তু ঝন্টুটা এমন লম্বালম্বা প্রশ্ন ছুঁড়তে আরম্ভ করল যে, ব্যাঙ্কে আসাটাই নিরাপদ মনে হল সুমনের। ঝন্টু আসলেই অনেক বিজ্ঞ হয়ে গেছে, কথায় কথায় বোদ্ধাদের মতো মন্তব্য করছে। খাবার টেবিলেও কেমন পণ্ডিতের মতো বলল,
“সার, অন্ন হইতেসে লক্ষ্মী, ফালায়েন না”  
“কি? ফেলছি কোথায়? একটু তেড়ে-ফুঁড়ে জবাব দিয়েছিল সুমন।”
“খাইতেসেনও তো না। হাত দিয়া ভ্যাটা-ভ্যাটা করতাসেন খালি।”
“তুই চুপ কর। যেটা বুঝিস না, সেটা নিয়ে কথা বলবি না একদম। আর এগুলো রান্না? মুখে তোলা যায় না! পারিস না তো করতে যাস কেন? ঝেঁঝেঁ উঠেছিল সুমন।”
“তাইলে পায়েস নিয়া আসি? ঐটা দিয়া খান?”
“লাগবে না।”
“ম্যাডামের নামে রান্ধা পায়েস, আপনে খাইবেন না? খুব অবাক হয়েছিল ঝন্টু।”
সুমনও থমকে ছিল। ঝিনুক চলে যাওয়ার পর, ওর জন্মদিনটা এভাবেই পালন করে আসছে সুমন। ঝন্টুও খুব উৎসাহে পায়েস বানায়। অচেনা-অজানা ম্যাডামের প্রতি ওরও যেন একটা গভীর ভালোবাসা বোধ কাজ করে। সত্যি কথা বলতে কি, ঝন্টু আছে বলেই বোধহয়, ঝিনুক আরও বেশী করে জীবন্ত। ঝিনুক কি খেতে ভালোবাসতো, কি কি পছন্দ ছিল ওর, সবটাই ঝন্টুর জানা। ও’ই যেন ঘরের প্রতিটা কোণায় ঝিনুককে ছড়িয়ে দিয়েছে টুকরো টুকরো করে। অষ্টপ্রহর ঝিনুকের অস্তিত্ব চারপাশে, অথচ তা সত্বেও সুমন কত সহজে ভুলে গেল ঝিনুকের জন্মদিনটা!
পায়েসের বাটিটা নিয়েও নাড়াচাড়া করছিল সুমন। দমচাপা কষ্ট হচ্ছিল ভেতরে। মনে হচ্ছিল, ঝিনুকের জন্মদিনটা ভুলে যাওয়ার পর, এই পায়েসের বাটিতে তার কোন অধিকার নেই। মুখে তুলেও গিলতে পারছিল না একটুও।
“খায়া ফ্যালান সার। আপনে না খাইলে ম্যাডাম কষ্ট পাইবেন। উনি কিন্তু আপনারে দেখতেসেন।”
চোখটা ছলছল করে উঠেছিল সুমনের। গলা দিয়ে উঠে আসা কষ্টটাকে অনেক কষ্টে ভেতরে ঠেলে দিয়েছিল সুমন,
“তোর ম্যাডাম তো আমার থেকে অনেক দূরে রে ঝন্টু।”
“ম্যাডাম আপনেরে অনেক ভালোবাসতেন সার। তিনি আপনের পাশেই আসেন। আপনে বুঝতে পারেন না।”
সত্যি, ঝিনুক মারা যাওয়ার পর প্রথম প্রথম সুমনের মনে হত, এই বুঝি ঝিনুক পাশে এসে বসল, এই বুঝি হাসছে। তখন ওকে অনুভব করতে পারতো সুমন। এখানে এসেও কতদিন মনে হয়েছে, খাটের ওপাশটাতে ঝিনুক শুয়ে আছে। একটা চেনা স্পর্শ যেন গায়ে লাগত। কখন যে সেসব মুছে গেছে সুমন বুঝতে পারেনি। এর কারণ কি শুধু বয়ে চলা সময়? নাকি অপর এক ঝিনুকের উপস্থিতি?
“সার, যন্ত্রণা বাড়াইলেই বাড়ে। তার কোন সীমা নাই। আকাশ-পাতাল ভাবিলেও কিনারা করন যায় না। জীবন য্যামনে বয়, অমনি বয়াই ভালো।”
সুমন অবাক হয়েছিল খুব। কত জটিল কথা, এত সহজে বুঝে নিয়েছে ঝন্টু? কি করে পেরেছে? ঐ হাসিটার আড়ালে কতখানি যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে তবে? কতটা ব্যাথা-বেদনা আড়াল করে রাখে ঝন্টু?
ভাবতে ভাবতে শিরদাড়াটা যেন অজান্তেই সজাগ হয়ে গেছে! সামনে টেবিলে একটা ছায়া পড়েছে। বুকের কাঁপুনিটা বলে দিচ্ছে এই ছায়াটা কার, ঝিনুক মিত্রের।
“সুমনদা, চেকের সিগনেচারটা একটু ভেরিফাই করে দিন না। কনফিউসান আছে। আর- এর গণ্ডগোল লাগছে।”
কাঁপা হাত বাড়িয়ে চেকটা নিয়েছে সুমন, কিন্ত ঠিক ঠাহর করতে পারছে না। কম্পিউটারের পাসওয়ার্ডটা যেন কি ছিল? আলটপকা কি-বোর্ড টিপতে শুরু করেছে এবার। হাত কাঁপছে রীতিমতো। তার ব্যবহারে ঝিনুকও থমকেছে খানিকটা।
“কি হয়েছে সুমনদা? শরীর খারাপ নাকি?”
“না, না, তেমন কিছু নয়। তড়িঘড়ি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল সুমন।”
“আপনি ঘামছেন তো! সরুন সরুন, আমি চেক করে নিচ্ছি। আপনি গিয়ে মুখে চোখে জল দিয়ে আসুন”
বিনা বাক্য ব্যায়ে উঠে পড়ল সুমন। নিজেকে চিনতে পারছে না একদম। এ কি! নয় নয় করে তো প্রায় একবছর হতে চলল ঝিনুক এই ব্রাঞ্চে সিঙ্গল উইণ্ডো অপারেটর হিসেবে জয়েন করেছে। কোনদিন তো এমন হয়নি! এবার নিজেকে ভয় পেতে শুরু করেছে সুমন। প্রথম যেদিন ঝিনুক নামটা শুনেছিল, বুকটা দুমড়ে গিয়েছিল। মৃত প্রেমিকার নামের সাথে হঠাৎ মিলে গেলে সেটাই স্বাভাবিক।তারপর একটা ভালো লাগা হয়তো তৈরী হয়েছে, কিন্তু সেটা তো শুধুমাত্র ঝিনুক নামটার কারণে। তবে এই ভয়টা কিসের? তীব্র অসহায়তার? নাকি ঝিনুকের প্রতি আজীবন নিবেদিত থাকার সাধনায় বিঘ্নের?
বাথরুমে গিয়ে ভালো করে চোখে, মুখে জলের ঝাপটা দিল সুমন। ঘাড়ে-গলায় জল দিল থুপে থুপে। সামনের আয়নাটায় নিজের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে । নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল, এই তিনবছরে কতটা পাল্টেছ সুমন গাঙ্গুলী? এতটাই যে নিজের ভেতর থেকে ঝিনুক গাঙ্গুলীকেও ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছ? ভালোবাসা এত ঠুনকো? নাকি আর পাঁচজনের মতো তুমিও জৈবীক চাহিদার কাছে হার মানলে? ছুঁতে ইচ্ছে করে এই ঝিনুককে? কাছে পেতে চাও? আর পারল না সুমন। ধপ্ করে সে বসে পড়ছে বাথরুমের মাটিতে। বুক ঠেলে উঠে আসছে গরম হাওয়া। কাঁদছে, অসহায় শিশুর মতো সুমন কাঁদছে।


                                                                     তিন

     “ভালোবাসা বড়ই জটিল বিষয় সার। পুরাই জীবন চইলা যায়, তাও আসল ভালোবাসা মিলে না।”
আকাশে বেশ বড়, গোল একটা চাঁদ উঠেছে। পূর্ণিমার চাঁদ। বারান্দায় বসে ঐ চাঁদটাকেই দেখছিল সুমন। সঙ্গী সেই একজন, ঝন্টু। এই জলপাইগুড়িতে আসার পর থেকে বারান্দায় বসে চাঁদ দেখাটা নেশা হয়ে গেছে। মনটা খালি হয়ে যায়। মনে হয়, জগতে বোধহয় ঐ চাঁদটাই একমাত্র স্বাভাবিক সত্য। বাকি সবই আপেক্ষিক। আজও সেই একইরকম অনুভূতি হচ্ছে, এরমধ্যে ঝন্টুর বলা কথাগুলো যেন আশ্চর্য এক সমাপতন। ঘাড় ঘোরালো সুমন,
“কেন বললি?”
“জীবন বড় শক্ত সার। সময়ের সাথে সাথে সবই বদল হইয়া যায়, তো ভালোবাসা থাকে ক্যামনে কন? দীর্ঘশ্বাস ছুঁয়ে এল ঝন্টুর চিবুক।”
“ভালোবাসা কি খুব ঠুনকো রে ঝন্টু? ব্যগ্র গলায় জানতে চাইল সুমন।”
“কি বলেন সার? ভালোবাসা পল্কা না? হাত থেইকা ফস্কাইলো কি চুরচুর। একটু আঘাইতেই তো ভাইঙ্গা শেষ, সন্দেহ দানা বান্ধলেই ভালোবাসা পালায়।” ঝন্টু খানিকটা উদাস।
অজান্তেই বুঝি সুমন ঝন্টুর দিকে তাকিয়ে আছে বেশ কিছুক্ষণ। আত্মহারা ভাবেই ফুটে উঠল স্বরধ্বনি,
“আমিও যদি তুই হতে পারতাম?’’
“কেন সার?”
“হয়তো আরও বেশী কিছু উপলব্ধি করতে পারতাম জীবন নিয়ে!”
“জীবন যখন নিজেই শিখায়, তখন আর ঝন্টু ঘরামী হওয়া লাগে না সার।”
ঝন্টুর মুখে আবারও সেই হাসি। এবারে যেন খানিকটা বিষন্ন, ক্ষয়িষ্ণু। ভেতরের কিছু কথা যেন বেড়িয়ে আসতে চাইছে। কিছু কি বলতে চাইছে ঝন্টু? আবারও মাথার উপরে চাঁদটায় চোখ রাখল সুমন। জোছনার অন্ধকারে চারপাশটা মায়াবী। জোছনার অন্ধকার? নিজের কাছেই ভীষণ অদ্ভুত লাগল সুমনের। সত্যি, অন্ধকারই তো। জোছনা তো আলো-আধারী। অথচ কারোর চোখে সেই আঁধারটা ধরা পড়ে না। সবাই ঐ কুড়িয়ে পাওয়া আলো নিয়েই খুশী। সুমনও যে কেন পারে না ওদের মতো? আর পারে না বলেই বোধহয় ঐ গোল চাঁদটার সামনে নিজেকে ভীষণ কাঙাল মনে হয়। রহস্যময়তা ভিড় করে যায় দু’চোখে। আজকের রাতটাতেও কত রহস্য লুকিয়ে আছে। আকাশে, চারপাশের প্রকৃতিতে, সুমন আর ঝন্টুর মনের ভিতরেও। এর মধ্যে থেকে কিছু রহস্য যদি ভেঙ্গে যায় যায় তবে ক্ষতি কি? আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে ঝন্টুর দিকে তাকালো সুমন,
“তুই এত হাসসিস কেন ঝন্টু?”
“হাসিই তো সব সার। হাসতে না জাইনলে বাঁচুম ক্যামনে?”
“তোর বাড়িতে কে কে আছে রে?”
“আসিল তো অনেকেই। তবে কাউরে জ্ঞান হওয়া পর দেখি নাই। মায়ের মুখটুক হালকা ভাসে।”
“কবে মারা গিয়েছেন?”
“তা তো কইতে পারুম না সার। বাইচা আসেন কিনা তাও তো জানি না।”
অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সুমন। ঝন্টুর মুখের হাসিটা যেন ভাবলেশহীন। তবে সুমনের মুখের প্রশ্নচিহ্নটুকু পড়ে ফেলেছে সে।
“মায়ের প্যাটে থাকতেই বাপ মরসিল। মায়ে অনেক কষ্টে ঠাই নিসিল বাপের বড় ভাইয়ের কাসে। তবে অভাবের দায় বড় দায়। পড়লাম কঠিন অসুখে। মায়ে বাঁচাইতে পারতেসিল না কুনো ভাবেই। তাই উপায় না পাইয়া অনাথ কেন্দ্রে দিয়া দিসিল। ঐখানেই আমার সব। মায়েরে আর দেখি নাই।”
অজান্তেই যেন বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল সুমনের। চওড়া সিঁদুর, অগোছালো আঁচল, পরিচিত গায়ের গন্ধ এসে জড়ো হচ্ছিল। মা। ঝিনুককে নিয়ে একদিন বেড়িয়ে এসেছিল ঐ বাড়ি থেকে। পেছন থেকে মা’র পরিত্রাহি চিৎকার শোনা যাচ্ছিল, “তোরা কখনও সুখী হবি না। তোরা কখনও সুখী হবি না…..!” উফ্! মায়ের কথা ভাবলেই কেন যে শুধু এই কথাটাই মনে পড়ে! আরও তো কত কিছু আছে, মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুম, মায়ের মাখা ভাতের দলা….। সুমনের বাড়ি ফিরতে একটু দেরী হলেই মা কেমন ঘর-বার করত। তাহলে কেন চোখ বুজলেই মায়ের ঐ কথাগুলোই শুধু শুনতে পায় সুমন? ঝিনুকের সাথে সত্যিই ওর থাকা হল না বলে? গলাটা ভারী হয়ে আসছে ওর, তুমি ভালো থেকো মা।
ঝন্টু এখনো সময়ের বুক থেকে তুলে আনছে অজস্র অজস্র ছেঁড়া পাতা। হাসির অনবরত ভাঙচুর খেলা করছে মুখের আনাচে-কানাচে। সুমন লক্ষ্য করছে ওর মুখের পেশীর ওঠা-নামা। তিন বছর ধরে প্রতিদিন ঝন্টুকে সে নিজের সামনে অহরহ দেখছে। অথচ কোনদিন ওকে জানার চেষ্টা করেনি কেন? প্রয়োজন হয়নি বলে, নাকি ঐ হুইলচেয়ারে বসে নিজেকেই মনে হত এই পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখি মানুষ, তাই? ঝন্টুর ডাকেই ভাবনাটা আলগা হয়ে গেল সুমনের,
“জানেন সার, আমার মায়ে আমার নাম দিসিল সোনা। কখন যে ঝন্টু ঘরামী হয়া গেসি জানি না।”
“তুই কাউকে ভালোবেসেছিস ঝন্টু? ঝন্টুর দিকে তাকিয়ে থেকেই জানতে চাইল সুমন।”
“বিয়াও করসিলাম, টিকে নাই। অবশ্য ময়নায় কইসিলো, “আমারে বিয়া কইরো না, আমি ভালো মাইয়া না।’’ শুনি নাই। আমার যখন টি.বি’তে মরমর দশা হইল, একদিন সকালে দেখি ময়না আর বাসায় নাই। কই গিসে আইজও কইতে পারি না। সবাই কয় পাশের বাসার হারু মিস্ত্রীর সাথে ভাগসে। বিশ্বাস করতে মন চায় না।”
“তাও তুই হাসিস? ভীষণ আশ্চর্য হয়েছে সুমন।”
“কানসিলাম সার। কিন্তু কাইন্দা কিসু পাই নাই। তাই এখন খালি হাসি। যদি কিসু পাই!”
নিজেকে হাতড়াচ্ছিল সুমন। কেবলই হাতড়াচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, কি যেন এখনো বাকি! কি যেন হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। কি নেই? কোথায় যেন গিয়ে হাতটা ঠেকল। হাসি। হ্যাঁ, হাসিই তো নেই সুমনের জীবনে। খুব ইচ্ছে করছে হাসতে। জোর করে একটুকরো রেখা ছড়িয়ে দিতে ভীষণ চেষ্টা করল সুমন। পারছে না। কি যেন ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মুখটাকে চিনতে চেষ্টা করছে সুমন। ঝিনুক গাঙ্গুলী নাকি ঝিনুক মিত্র্র? পারছে না, কিছুতেই পারছে না। কোথায় যেন এক হয়ে যাচ্ছে বারবার। আবার। আবারও।


চার

     খাবারের গ্রাসটা মুখে তুলেও ঠিক মতো গিলতে পারছিল না সুমন। টেবিলের ও’পাশে ঝিনুক বসে আছে বলেই কি? এখন আধঘন্টা লাঞ্চ আওয়ার। যদিও ব্যাঙ্কের ভেতরে মানুষ-জনের কমতি নেই। কেউ লাইন ছেড়ে চেয়ারে বসে আছে হালকা মেজাজে তো কেউ এখনো নিজের জায়গা অখণ্ড প্রয়াসে ধরে রেখেছে। কিন্তু তবুও অসহ্য্ চাপ থেকে খানিকটা সাময়িক বিরতি।
সুমন এই ব্যাঙ্কে জয়েন করেছিল বছর আটেক আগে। দেশের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। পরীক্ষা দিয়েই সোজা প্রবেশনারী অফিসার। বাড়ির লোকের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা করার আগেই সব থামিয়ে দিয়েছিল সুমন। ঘড়ি কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে সুমন এখন পি.বি.ডি. সেকশানের ম্যানেজার। আর ভাগ্যের চাঁকা ঘুরতে ঘুরতে কোলকাতা ছেড়ে জলপাইগুড়ি। অবশ্য কোলকাতা শহরটাকে ছেড়েই তো যেতে চেয়েছিল ও। ঝিনুকের মৃত্যুর পর আপন বলতে তো আর কেউ ছিল না ঐ চেনা শহরটায়। তাই ঐ হুইলচেয়ার সঙ্গী করেই জলপাইগুড়ি পাড়ি দিয়েছিল সুমন। সমস্ত পিছুটান ফেলে।
    ঝিনুকের সাথে সম্পর্কটা সুমনের বাড়িতে কেউ মেনে নেয় নি। এমনকি ঝিনুকের মৃত্যুর পরও না। সেটা অবশ্য সুমন-ঝিনুক দুজনেই জানতো। কিন্তু বরফ যেন পাথরই হয়ে গেল। ঝিনুকের চলে যাওয়াটাও সেটা ভাঙতে পারল না। বাবা-মা কেন, সমাজের কেউই তো কোনদিনও স্বীকৃতি দেবে না এই ভালোবাসাকে। সুমনের বাড়ির চৌকাঠে, ষোড়শবর্ষে পা রাখা ঝিনুক তো আসলে সুমনেরই মাসতুতো বোন। নিজের মেজো মাসির একমাত্র মেয়ে। বাবা-মার মৃত্যুর পর ভীষণ আদরের বোনঝিকে নিজের কাছে আনতে একবারও ভাবেন নি মা। বাবাও দ্বিমত করেন নি। বাবা-মায়ের একটা মেয়ের খুব সখ ছিল। সেই জায়গাটা ভরিয়ে দিয়েছিল ঝিনুক। কিন্তু চার দেওয়ালের ভেতরে ভেতরে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, সেটাই বা কে বুঝতে পেরেছিল?
এখনো মনে পড়ে সুমনের, একের পর এক বিয়ের সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিচ্ছে ঝিনুক। মায়ের অবাক চোখে ফুটে উঠছে হাজার হাজার প্রশ্ন। বাধ্য হয়ে মা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল ঝিনুককে,
“তোর কি কোন পছন্দ আছে মনা? থাকলে বল, আমরা দেখাশোনা করি।”
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছিল সুমন, বুকের ভেতর থেকে গুমরে ওঠা কান্নাটাকে লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঝিনুক। ফুসফুস থেকে উঠে আসা ঝড়টাকে বদলে দিয়েছিল কাতর অনুনয়ে,
“তোমরা আমায় বিয়ে দিও না মাসি। আমি এখান থেকে কোথাও যেতে পারব না। আমায় এখানে থাকতে দাও।”
মা সেদিন কিছু বুঝেছিল কিনা সুমন জানে না আজও। কিন্তু এরপরই যেন মা আরও উঠে পড়ে লেগেছিল ঝিনুকের বিয়ের জন্য। ঝিনুক, সুমন এমন কি বাবার নিষেধের গণ্ডীও মাকে বাঁধতে পারেনি। এরপরই এসেছিল সেই চরম দিনটা। বাবার হতভম্ব চেহারা, মার আর্তনাদ, কিছুই আটকাতে পারেনি ওদের। সেদিন গন্তব্য ছিল একটাই, ধর্মবদল। সমাজবদল আর স্বীকৃতি। কিন্তু একটা স্বপ্নও পূরণ হলনা। ইমামের কাছে যাওয়ার আগেই ঘটে গিয়েছিল ঐ ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।
অ্যাক্সিডেন্টে ঝিনুককে বাঁচানো যায়নি। সুমন এখনও আধা-অথর্ব। বাঁচানো যায়নি এক রতি সুখও। আজ খাবার টেবিলের ও’পাশে বসে থাকা অন্য ঝিনুককে দেখে পুরোনো সব কথা সিড়ি বেয়ে উঠে এলো ওপরে। ঐ এক রতি সুখ কি খুঁজে নেওয়া যায় না? খুঁজে নেওয়া যায় না এই ঝিনুক নামটার ভেতরে? ঝন্টুর মুখের হাসিটা কি হেসে দেখা যায় না একবার?
আজ বাড়ি ফিরে অনেকদিন পর সুমন ঝিনুকের ছবির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কি যেন কষ্ট হচ্ছে ভেতরে। কিসের কষ্ট? তার ভেতরের দ্বন্দ্বের? কি চাইছে সে? বুঝতে পারছে না কিছুতেই।
“সার। ঝন্টু এসে দাঁড়িয়েছে কখন সুমন বুঝতেও পারেনি।”
“ঝন্টু, তুই তো সব জানিস। তোকে তো সব বলেছি। আমার কি করা উচিৎ রে? সুমনের গলার আকুলতা ছড়িয়ে গেছে ঘরে।”
“আগায়েন না সার।”
“কেন?”
“আপনি ঐ নামের ভিতর ম্যাডামরেই খুঁজতাসেন। এইটা ঠিক না।”
চমকে উঠেছে সুমন, - “কি বলছিস তুই?”
“যে ভালোবাসার জন্যে আপনে ঘর, সমাজ সব ছাড়সেন, এইটা সেই ভালোবাসা না। সেই ভালোবাসা আর ফিরৎ আসবে না সার। শুধু নামটাই এক, মানুষ দুইটা কিন্তু এক না।”
“তাহলে কি এই যন্ত্রণা নিয়েই থাকব আমি সবসময়? ছিটকে এসেছে কথাগুলো সুমনের স্বরযন্ত্র থেকে।”
“থাক না সার। এই কষ্ট তো আপনি নিজেই বাইছা নিসেন ম্যাডামরে ভালোবাইসা। আমিও যেমন ময়নারে বিয়া কইরা বাইছা নিসি। যেইটা নিজেই নিসি সেইটা নিয়া আফসোস কিসের?”
সত্যিই তো! এই বেদনা, এই দুঃখ-কষ্ট, সব তো সুমনেরই নির্বাচিত। ওরই বুকের ভেতর বহু সযত্নে রাখা। ঝিনুক, ঝিনুকের ভালোবাসা, না পাওয়ার সবটাই তো একমাত্র সুমনের। তবে কেন এত দ্বিধা, এত দ্বন্দ্ব! হাসতে চাইছে সে। ভীষণভাবে হাসতে চাইছে। ঠোঁটের পেশীগুলো শিথীল হচ্ছে আস্তে আস্তে। সুমন হাসছে। অনেকদিন পর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

CSS Drop Down Menu
আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com- এ মেল করে।