আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com-এ। ভালো থাকুন সকলে। চলতে থাকুক কলম। বলতে থাকুক শব্দ।

প্রচ্ছদ

A SAHITYA-ADDA Initiative C/O:sahitya A BLOG MAGAZIN STAY WITH US THANK YOU
bloggerblogger

মঙ্গলবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৪

গল্পঃ কেয়ার অফ বিশ্বাস / পূর্ণপ্রভা ঘোষ

       
          
           অনেকদিন পরে ছাদে উঠলাম। এখন সাড় পাঁচটা বাজে, ঘরের ভেতর রোদের তেজ বোঝা যায়নি, বাপরে এখনও চোখ ঝলসে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে সয়ে এল রোদের দাপট, খুব ভালো লাগছে চারিদিকটা। এখনও এত গাছপালা আছে বোঝা যায়না ঘরের থেকে। বাঃ! বেশ লাগছে তো চারপাশ! উদার আকাশ।
           প্রথমে ছাদে উঠতে হবে বলে মেজাজ গরম হচ্ছিল, এখন খুব ভালো লাগছে এখানে এসে। আজ আমাদের কমলাদেবী বিকেলবেলায় ডুব মেরেছেন হঠাৎ
এমনিতে খুব একটা কামাই করেনা, তাছাড়া দরকারে চাইলেই আমিতো ছুটি দিই
শুধু বলে রেখেছি ‘বলে কয়ে ছুটি নিবি, মিথ্যে মিথ্যে কাহানী শুনিয়ে হুটপাট কামাই করবিনা যেন।’ তা বছরপাঁচেক তো দিব্যি চলছে, সেরকম কিছু ঝামেলা হয়নি।
ওর মত বিশ্বাসী মানুষ খুব বেশী পাওয়া যায়না যে।
          এই মাসকয়েক কি যে করছে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে আমার। কখন বলে ছেলের শরীর খারাপ, কখন বলে মেয়ের হঠাৎ বিয়ে ঠিক হল, এমনি নানান গল্প শুনতে শুনতে এই কয়মাসে আমিও জেরবার।
          সহজে সবকিছু বিশ্বাস করে নিই বলে, ছেলে মেয়ে কর্তা সবাই আমাকে বোকা বলে। সে বলুকগে, মিছিমিছি লোককে অবিশ্বাস করব কেন? বাবা বলতেন, ‘বিশ্বাস করে ঠকা ভালো, তবু অবিশ্বাস করে নয়’। কথাগুলো ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে গাঁথা, সহজে তাই অবিশ্বাস আসেনা। অথচ কত কতবার সেজন্য ঠকতে হয়েছে। তা করারই বা কি আছে? ছেলেমেয়েরা হাসাহাসি করে, কর্তা ক্ষেপায় কিন্তু আমার স্বভাব পাল্টাতে পারিনা, চাইও না
          যুগ পাল্টেছে, মানুষের ধরণ-ধারন হাবভাব পাল্টেছে, পাল্টেছে মানুষের চিন্তাভাবনা, দিনকালও যেন সেই আগের মত নেই! কিন্তু আমি আর নিজেকে পাল্টাতে পারলাম না, সেই বোকা বোকা একা একা রয়ে গেলাম।
          ওই উত্তরে নতুন মেট্রোস্টেশন দেখা যাচ্ছে, বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে তো দূর থেকে! দুএকবার মেট্রোতে চড়েছি, কত বছর হোল কলকাতায় বাস করছি, সেই বিয়ের পর থেকে দেখতে দেখতে হয়ে গেল উনিশবছর! কতদিন, কতগুলো বছর? এখনও আমার গা থেকে গ্রামের গন্ধ বেরোয়, লোকজন ঠিক বুঝতে পারে। আসলে আমি চাইনি কোন ভাবে আমাকে শহরের চাকচিক্য গ্রাস করুক। একটুকরো গ্রাম যে এখনও আমার মধ্যে ধরে রাখতে পেরেছি তাতে আমি ভীষন খুশী। সবাই যতই হাসুক না কেন!
          এই ভাবে নিজেকে কতদিন ভাবা হয়না। অনেকদিন পরে ছাদে উঠে তাই বেশ লাগছে। পশ্চিমে সূর্যদেব চলেছেন অস্তাচলে, নিটোল কমলা-গোলাপী রঙের সিঁদুরের টিপ যেন। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে, মা এমনি সুন্দর করে কপালে টিপ পরতেন, সে ও অনেকদিন আগের কথা!
          দশবছর হয়ে গেছে বাবা চলে গেছেন। মায়ের কপাল অনেকদিন হয়ে গেল খালি, শুন্য! তবুও মায়ের কথা মনে পড়লেই সিঁদুরের টিপ পরা মায়ের মুখখানি প্রথমেই চোখের সামনে জেগে ওঠে। আসলে এটাই আমার রোগ, অতীত থেকে মনটা বর্তমানে ফেরেনা কিছুতেই তাড়াতাড়ি। কেবল ফিরে ফিরে চলে অতীতের দিকে।
অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস গলার কাছে আটকায়, জানিনা কেন!
            আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। কর্তা সরকারী চাকুরে। দাদাশশুরের আমলের তৈরী বাড়ীতে আমরা দিব্যি সবাই হাতপা খেলিয়ে বাস করি। আমার শশুরমশাই ছোটভাই, আমরা এই অংশটা পেয়েছি ভাগে। শশুরমশাইয়ের একমাত্র ছেলে আমার স্বামী, তাই পুরো একতলাটাই আমাদের জন্য। একটিমাত্র ননদ, আমার সঙ্গে গলায় গলায় বন্ধুত্বস্বামীর থেকে তিনবছরের বড়দিদি। শশুরশাশুড়ীকে চোখে দেখিনি আমি, স্বামীর বয়স যখন মাত্র বারো তখন শাশুড়ী মারা যান। শশুরমশাই দুই ছেলেমেয়েকে একা হাতে সামলে রেখেছিলেন। আবার বিয়ে করে সংসার করার বয়স তো ছিলই, তাছাড়া ও সংসার সামলানোর জন্য কাউকে ঘরে আনতেই পারতেন।
তিনি তা করেননি, মাত্র পনের বছরের দিদির হাতে বারোবছরের ভাই ও পুরো সংসারের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পেরেছিলেন তিনি।
            অবশ্য ওপরের তিন দাদাদের সবাই মিলে দুটি ভাইবোনকে আগলে রাখত বুকে করে। শশুরমশাই সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান। চারতলা বাড়ীর চারটে তলা চার ভাইয়ের, তবে এখন আর কোনো ভাই বেঁচে নেই, সবাই পরের প্রজন্মের। সবতরফেই অনেকগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে বিরাট জমজমাট সংসার। স্বামীরাই কেবল দুটি ভাইবোন নিচের তলায়। অবশ্য সব বাচ্চারা মিলে হুটোপাটি করে একসঙ্গে কাটিয়েছেন ছোটবেলা, সেই গল্প শুনতে শুনতে মুখস্ত হয়ে গেছে আমার। আমারও মনের মত।
            ননদের যখন বিয়ে ঠিক হল তখন আমার স্বামী সবে কলেজের দরজায় পা রেখেছেন, তিন বছরের বড়দিদির সেকি হাউ হাউ কান্না। ভাইকে কে সামলাবে, বাবার দেখভাল কে করবে এইসব নানান হাজারো চিন্তা।
            ননদের শশুরবাড়ীর লোকেদের হাসি আর ধরেনা। ওরে বাবা এইতো এপাড়া ওপাড়া, দেখাশোনার অসুবিধে কই? সত্যি কথাই একেবারে। পরের বছর দূরারোগ্য ক্যানসারে বাবা হলেন শয্যাশায়ী, স্বামীর একার পক্ষে সেসব সামলানো মুশকিল ছিলই যদি না বড়ননদ সবসময় পাশে থাকতেন। তাঁর শশুরবাড়ীর সবাই ও এত ভদ্র, সত্যি প্রশংসা না করে থাকা যায়না। জামাইবাবু মানুষটিও খুব ভালো
বলতে গেলে একেবারে আদর্শ দম্পতি। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তিন ছেলেমেয়েও রত্ন। আমার ছেলেমেয়ে দুটি তো পিসতুতো দাদাদিদির অন্ধভক্ত। হবে নাই বা কেন!
         কোন ভাবনা থেকে কোথায় চলে এলাম। অনেকদিন পরে ছাদে উঠেছি, কমলার হঠাৎ কামাই করার ফসল। আমাদের বাড়ী ছাড়া আর দুএকটা যা এপাড়ার নিজস্ব বাড়ী। নইলে চারিদিকে হুহু মাথা তুলেছে দৈত্যাকার উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ী। খোপে খোপে মানুষের টুকরো টুকরো সংসার। এপাড়ায় চারিদিকে প্রতিদিন কত নতুন নতুন মানুষের আনাগোনা। অবাক তাকাই চারিদিকে, প্রায় পৌনে তিনহাজার স্কোয়ারফিট নিয়ে আমাদের একতলায় চারজনের সংসার, আর সেই জায়গায় ওইসব ফ্ল্যাটবাড়ীতে প্রায় চারটে পরিবার বাস করে! অবশ্য আজকাল পরিবার মানেও তো সেই আপনি কপনি। আমাদের সংসারটিতে বড়ননদের ও সমান ভাগ, তবে তিনি ও ভালভাবে বুঝিয়ে বলে দিয়েছেন, ‘না বাবা, এসে বসলে একগ্লাস জল দিবি, একটু মান্যিগন্যি করবি, আর কিছু চাইনা’ ওসব ভাগবাঁটোয়ারায় আমাকে টানিস না। জামাইবাবুর ও বক্তব্য একই।
          আমি যখন প্রথম শশুর বাড়ী আসি, বড়ননদ আমাকে হাতে ধরে কাজকর্ম সব শিখিয়েছেন, বলতেন ‘মাবাবা নেই, আমিই তোর শশুর আমিই তোর শাশুড়ী, আর ওপরের ওরা ও সবাই তোর আপনার জন’। তখন ওপরের তলার বাকি আত্মীয়স্বজন ও আমাকে দশহাতে আগলে রাখত, সকলেই নিজের করে বুকে টেনে নিয়েছিল মুহূর্তে। অথচ মাঝখানে কি যে হোল, এখন কেউ কারো মুখ দেখেনা পর্য্যন্ত। কি যে সম্পত্তি সম্পত্তি বুঝিনা বাপু, অতশত মাথায় ঢোকেনা।
          আসলে বুঝতে পারি, ওপরের তলা গুলোয় লোকজন অনেক, স্থান সঙ্কুলান হয়, অথচ আমাদের ফেলে ছড়িয়ে বাস। বড়ননদ ও ভাগ নেননি। আস্তে আস্তে মানুষের মনে নিজেদের না পাওয়া আর অন্যদের সহজে পাওয়ার ব্যাপারটা কখন যে ধীরে ধীরে সম্পর্ক অসহজ করে তোলে বোঝা মুশকিলতার মধ্যে বাকি আত্মীয় পরিজন, কাজের লোক সবাই এক একটা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় যে যার সুবিধে মতো এইতো কদিন আগে ও আমরা সবাই একসঙ্গে হৈ-হল্লার সীমা ছাড়াতাম অথচ আজ? কেউ কারো মুখ দেখতে চায় না! আমি না চাইলে ও এখানে আমার ও একটি ভূমিকা থেকে গেছে।
          সবাই বলছেন, ‘বাপরে ভাবতাম সহজ সরল মন, পেটে পেটে এত কুচুটে’! বুঝতে পারিনা, কি ভাবে কোথায় কুচুটে হলাম!
          এই সব নানা কারনে ছাদে আসাটাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। আজ অনেক কাচাকাচি হয়েছে, শীতের সব গুছিয়ে না তুললেই নয়। মেয়েটাও কলেজে, বাধ্য আমাকেই উঠতে হল। কমলার মুখেই এটা সেটা কথা শুনি, তেমন বাইরে বেরোই না, আজ চারিদিকে তাকিয়ে তাই আনন্দের সীমা পরিসীমা থাকে না। চারিদিকে গিজ গিজ করছে মানুষে, সংসারে! পায়রার খোপে খোপে যেন মানুষের বাস! তাই সঙ্কীর্ণতায় উঠবেই তো ভরে মানুষ!
বড়, মেজ, সেজ সব তরফেই টুকরো টুকরো সংসারের ঘেরাটোপ। কষ্ট লাগে!
এই সেদিনেও উৎসব অনুষ্ঠানে গায়ে গা লাগিয়ে কাজ সামলেছি সবাই মিলে, কখনই কোনো গন্ডগোল হয়নি! হাসিমুখে সব কয়টি তরফের ননদ-জায়েরা মিলে ভাগ করে নিয়েছি খাওয়া দাওয়া থেকে কাজকর্ম সব কিছুইকই কোনো অসুবিধে হয়নি তো!
         কি যে হোল এখন! পরবর্তী প্রজন্মের কয়টি বৌমা আসার পর শুরু হল ঠন্ ঠন্, ঝন্ ঝন্ সব অস্বাভাবিক শব্দ!
         কতদিন পরে ছাদে উঠেছি বলে রাজ্যের ভাবনা চিন্তা আমায় পেড়ে ফেলল দেখছি। স্বামী বলেন, ‘যা হওয়ার তা হবে, তুমি তা রুখতে পারবে নাকি?
আর কথায় কথায় কষ্ট পেও না, ওভার ফ্লো হলে আটকাবে কে?’ হাসি মজায় আমায় কষ্ট ভোলানোর চেষ্টা তাঁর।
         সেজ তরফের ভাসুরপো উৎপল এই সেদিনে বিয়ে করে বৌ এনেছে, খুব ভালো মেয়ে স্নিগ্ধা, স্কুলে পড়ায়, শিক্ষিত ভদ্রসিঁড়িতে মুখোমুখী হলাম, হেসে বললাম, ‘কি স্কুলের ছুটি কবে থেকে? সারাদিন বাচ্চাগুলোর পিছনে দৌড়ে দৌড়ে চোখমুখের কি হাল...’ মুখের কথা আমার মুখেই থাকল, দরজাটা মুখের উপরেই দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড থমকে গেলাম, ভেতর থেকে আওয়াজ এল, ‘দরদ উথলে উঠছে একেবারে! আমার চোখমুখ ভালো নয় তাতে অন্যের কি? নিজে কি রূপসী রূপাঞ্জনা!’ হায় ভগবান!
         চটপট করে ছাদে আসার রাস্তা পাই না। অদ্ভুত না? অথচ এই কদিন আগেও এমন তো ছিল না পরিস্থিতি। কে জানে কোথায় কিভাবে কখন ঘুণ ধরেছে এই সংসারের কোন কোণে!
         সূর্যদেব কখন টপ করে মুখ লুকোলেন খেয়াল হলনা। নানান ভাবনায় কি ভাবে যেন ডুবে ডুবে যাচ্ছি। ঘরের মধ্যে এটা সেটা কাজে এইসব হাজারো ভাবনারা ধারে কাছে ঘেঁষেনা, তারাই বুঝি সুযোগ পেয়ে হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ছে একেবারে ঘাড়ের উপর।
         আমাদের বাড়ীর চারদিকে অনেকগুলো নারকেল গাছ। বেশ নারকেল হয়, বছরে এক দুইবার পাড়া হলে সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া। বেশ একটা হুলুস্থুল কান্ড। সব বাচ্চারা দুড়দ্দাড় দৌড়ে বেড়ায় আগে ভাগে। এই সেদিনে আমার বাচ্চারা ও এমনি হুল্লোড়ে মেতে উঠতো। মেয়ে এবারে কলেজে ফার্স্ট ইয়ার, একটু গম্ভীরভাব এসেছে তার চলাফেরায়, মুহূর্তে মুহূর্তে ব্যক্তিত্বের ঝলক! আমি দূর থেকে দেখি, অহংকার হয় মাতৃত্বের। ছেলে টুয়েল্ভ দেবে, দুজনেই পড়াশোনায় প্রথম সারির। এবারে নারকেল পাড়ার সময় যায়নি ছেলে, সেই নিয়ে নাহক কত কথা শুনতে হল।
           নারকেল গাছগুলোতে অনেক ডাব ধরেছে, দেখতে বেশ লাগছে। বেশ কয়েকটা কাক বাসা বেঁধেছে, কয়েক জোড়া কাককাকী সংসার সামলাতে ব্যস্ত। আমায় দেখে একজন ঠোঁট বেঁকিয়ে প্রশ্ন শুধোয়, ‘ক্ব’?
           বলি, ‘কি বলি বলতো? চারিদিকে হচ্ছেটা কি?’
আমার প্রশ্নের উত্তর হয়না বুঝি? উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে না করে তারা তাই নিজেদের মধ্যে আদর সোহাগে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
           অনেকদিন বাপের বাড়ী যাওয়া হয়না। কতদিন মাকে দেখিনা, ভাইপো ভাইঝিরা ও কত বড় হয়ে গেল। বিশেষ করে ছোট ভাইয়ের যমজ ছেলে মেয়ে, তাদের তো মুখ দেখাই হয়নি! বছর ঘুরতে যায়। বাপের বাড়ীর লোকেরা বলে আমি নাকি কলকাত্তাইয়া হয়ে গেছি। গ্রামে যেতে তাই চাই না!  
           আসলে আমিই বড় বেশী শশুরবাড়ী নিয়ে ভেবে ভেবে একেবারে  বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছি, কিছুই করতে পারবো না তবুও ভেবে ভেবে সারা। এই মানসিক অবস্থায় কোথাও যেতে ইচ্ছে করেনা। না! একবার সময় করে ঘুরে আসতে হবে। অন্ধকার হওয়ার আগেই চারিদিক আলোর ঝলকে ঝকমক করে সেজে উঠেছে। বাইরে কোথাও এতটুকু অন্ধকার নেই, অন্ধকার সব মানুষের মনের ভেতরে বাসা বেঁধেছে।
           নেমে আসি নিচে, ছেলে ফিরেছে স্কুল থেকে, বড়দি অর্থাৎ ছেলের পিসি ও দাঁড়িয়ে। ‘ও বাবা! কতক্ষণ’? আমি বোধহয় বেশ অনেক খানি সময় ছাদে ছিলাম, তাড়াতাড়ি চাবি খুলে দিই, ছেলে ঢোকে হুড়মুড়িয়ে।
           ছেলের জলখাবার রেডী করে দিয়ে আমাদের দুজনের চায়ের কাপ নিয়ে বসিবড্ড গম্ভীরমুখ বড়দির, হলটা কি?
            কর্তা ফিরে এলেন আজ তাড়াতাড়ি এবং যথারীতি গম্ভীর মুখ। চা ধরিয়ে দিলাম চটজলদী, ও বাবা তাতে ও গুমোট মেঘটা হঠেনা যে? ব্যাপার কি?
এবার সত্যি ভাবনায় পড়ি, কি হতে পারে? ‘সাংঘাতিক কিছু’?
            অনেকদিনের পুরোনো বাড়ী আমাদের, সেই সেকাল থেকেই ত্রিবর্ণ পতাকার হাতচিহ্নে সমর্থন করে এসেছে সবাই। আজকাল কানা ঘুঁষোয় শোনা যাচ্ছে লাল, নীল, কমলা নানান রঙ নাকি এ কোনে ও কোনে দেখা যাচ্ছে। আর এই সব নিয়ে বেশ কিছু অন্য লোক ও বাড়ীটার নানান বিষয়ে অযথা মাথা ঘামাচ্ছে ইদানীং।
আমরা ছিলাম নির্বিকার, এই সব বিষয়ের থেকে দূরে। প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা উপভোগ করার স্বাধীনতা আছে।
          আজ হঠাৎ একি শুনি? স্বামী বাইশ বছর ধরে সরকারী চাকরীতে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। হঠাৎ তাঁর নাকি বদলীর অর্ডার হয়েছে উত্তরবঙ্গে
          ‘মানে? মগের মুল্লুক নাকি’?
মানে হয় না! মগের মুল্লুক ও নয়, এসব হতেই পারে, সরকারী কাজের এটাই দস্তুর!
           নন্দাই ব্যাঙ্কের বড় অফিসার, একই সঙ্গে তাঁর ও নাকি বদলী হচ্ছে।
সাদা চোখেই তো ব্যাপারগুলো অস্বাভাবিক ঠেকছে, কেউ বুঝবেনা?
না, কেউ বুঝবেনা! এসব বোঝার মত পরিস্থিতি ও নয় নাকি এই সময়ে।
           কিছুই মাথায় ঢোকে না আমার। কয়েকমাসে নানান অস্বাভাবিক ঘটনাবলী ঘটে চলেছে চারিদিকে, আমি কিছুতে অত মাথা ঘামাই না, দিব্যি ছেলেমেয়ে স্বামী নিয়ে শশুরের ভিটেতে শান্তিতে থাকি, কারো সাতে পাঁচে থাকিনা, কিন্তু একি?
আমার অজান্তে কখন চারিদিকটা এত বদলে গেছে বুঝতে পারছি না।
           আমারই চারপাশে আমারি চেনা লোকগুলো কখন যে এত অচেনা হয়ে গেছে খেয়াল করা হয়নি। আজ আর রান্নাঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না, চুপচাপ বসে থাকি, ঘরের আলোটাও জ্বালতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কর্তা বাইরের ঘরে টিভিতে ব্যস্ত, বাজেট নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছে, সবাই যে যার মত বক্তব্য বলে চলেছে, মাথা ঘামাই না আমি। ছেলে তার ঘরে বোধহয় পড়াশোনা করছে, কিংবা কম্পিউটারে ব্যস্ত। বড়দি ফিরে গেছেন ঘন্টা খানেক হয়ে গেল। আমি একা একা কত কিছু ভেবে চলেছি। টনক নড়ে, মেয়েতো ফেরেনি এখন ও কলেজ থেকে? রাত্রি সাড়ে দশটা বাজে, এত দেরী করে না কোনোদিন! তাছাড়া আজ তো সেরকম কিছু বলেও যায়নি, উঠে আসি ধড়ফড় করে, বাবাকে জানাই মেয়ের কথা।
           ‘সেকি’! তিনি তো আকাশ থেকে পড়েন। তিনি জানতেন না মেয়ে এখনও ফেরেনি বাড়ী। প্রায় তিনহাজার স্কোয়ারফিটের বাড়ীতে আমরা চারটে মানুষ ফেলে ছড়িয়ে থাকলেও এত ছাড়া ছাড়া থাকিনা কখনও, কিযে হল সেই বদলীর খবর পাওয়ার পর থেকে।
          আপাতত ফোনে ফোনে চারদিকে খোঁজখবর চলে। রাত বাড়ছে, চারিদিকের নিস্তব্ধতা এসে গ্রাস করে ফেলছে আমাদের, কটা প্রাণী আমরা শুধু জেগে। কেঁদে কেঁদে আমাদের চোখের জল ও ফুরিয়ে গেছে, রাত্রি প্রায় শেষ হতে চলেছে এখনও মেয়ের কোন খোঁজ নেই, মেয়ের বাবা আর পিসেমশাই থানায় গিয়েছেন,  হয়ে গেল অনেক সময়, ওপরের ওরা কেউ একবার এসে দাঁড়াল না পর্যন্ত্য, অবাক হই। পাড়াপড়শী অনেকে এসে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু কি করে শান্ত হবো?     
কি হতে পারে মেয়ের? কিছু ভাবতে পারছি না, ভয়ে শিউরে উঠছি বারবার। অনেকে প্রশ্ন করছেন প্রেম ঘটিত কিছু হতে পারে কিনা? কই কোনোদিন তো সেই সব খেয়াল করিনি! আজ সকলের কাছে অযথা বকুনি খাচ্ছি, ‘কেমন মা? মেয়ের গতিবিধি কিছু খেয়াল কর না? মেয়ে বড় হয়েছে সে খেয়াল টুকু ও নেই!’
          কোনো উত্তর আমি নিজেই খুঁজে পাচ্ছিনা তো অন্যকে দেব কি?
রাত ফুরিয়ে সকালের সূর্য্য চারিদিকে আলোময় করে দিয়েছে, আমাদের চোখে অন্ধকার এখন ও ঘোচে না। থানা থেকে কোন সংবাদ এখন ও আসেনি, সর্বনাশের শেষ সীমা হাসপাতালগুলো থেকে ও কোনো খবর নেই। তাহলে?
          মেয়ের কলেজের কয়েকজন বন্ধু এসেছে সকালে, তারাও সবাই দিশাহীন। কি হতে পারে শেষপর্যন্ত ভেবে কূল কিনারা মেলে না। কে দেবে উত্তর?
আমি নিজেকে প্রশ্ন করার মত অবস্থায় নেই, তবুও ভাবছি আমার ভুল কোথায়?
          পুলিশের একজন বড় অফিসার মেয়ের বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন যদি কোনো ভাবে কোনো সূত্র মেলে। সেখানেও কোন সম্ভাবনা পাওয়া যায়না। এত যে আমি ছেলে মেয়ে স্বামী সবাইকে আগলে রাখি দুইহাতে সেখানেই কোথাও যেন ফাঁক থেকে গেছে! শুধু ঘর সংসারে নিমজ্জিত থেকে স্বামী সন্তানের সেবায় ব্যস্ত থাকাটাতে কোনো সার্থকতা নেই, এখন বুঝতে পারছি।
          কর্তা বাড়ী থাকাকালীন এই অবস্থা, বদলী হয়ে চলে গেলে সংসার কি হবে? আমি যে এক পয়সার যোগ্যতা রাখিনা, সে তো পদে পদে টের পাচ্ছি। কিন্তু মেয়ের খবর এখন ও কোথাও থেকে এলনা যে!
          আমার আর উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, সবই বড়দি সামলাচ্ছেন।
হঠাৎ কেমন এক আওয়াজ শুনে বাইরে আসি, কর্তা একা সোফায় বসে মুখ খানা অদ্ভুত ভাবে সাদা রক্তশুন্য! মাথার একঢাল চুল একরাতে সাদা হয়ে গেল কি করে?
না, আমি অনেকদিন ভালো করে তাকাই না?
          ‘কি হোল?’ দৌড়ে আসি, শুন্য দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাই,
‘এ কি?’ দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলি, নিমেষে গড়িয়ে পড়ি মেঝেতে।
আমার সমস্ত অহংকার, ভালোবাসা, সরলতা সব সবকিছু ধুলায় লুটিয়ে দিয়ে মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, নাটকের শেষ যবনিকা এভাবে ঘটবে ভুল করেও মনে জাগেনি।   
          ওপর থেকে এতক্ষণে নেমে আসে একে একে সব আত্মীয় স্বজন, তারা নাকি জানত! অথচ আমরা? বেশ কিছু পার্টির হোমরা চোমরা মানুষজন আসেন বাড়ীর ভেতরে, পুলিশের কিছু কর্তাব্যক্তি সেই সঙ্গে উপস্থিত হন।
          আমি অবাক চোখে দেখতে থাকি, আমি কি জেগে আছি? বিশ্বাস হয় না, সত্যি আমি জেগে রয়েছি?
          আমার মেয়ে অ্যাডাল্ট, সুতরাং আমরা আর কিছুই করতে পারিনা।
‘কিছু মানে’? আমাদের শিক্ষাদীক্ষা, সভ্যতা, ভদ্রতা সততার কোনো দাম নেই?
মাবাবা হিসেবে আমাদের বলার কিছু থাকবে না?
          বড়দি এসে হাল ধরেন, আমাদের ভেঙে পড়া অবস্থা থেকে টেনে তোলেন জোর করে। ‘যা হওয়ার তা তো ঘটে গেছে, এবার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে সে কথা ভাব’। কি ভাববো? আর কি আছে ভাবার?
          ‘আছেই তো, এখানেই সব শেষ নাকি’? এখান থেকে শুরু হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। সব তরফই রাজী ছিল এই সুন্দর বাড়ীটা প্রোমোটারের হাতে তুলে দিতে, কেবল আমরাই মত দিইনি এতদিন।
          সারারাত দুর্ভাবনায় ফেলে সকাল বেলা মেয়ে ফিরলো প্রোমোটারের হাত ধরে একমাথা সিঁদুর মেখে, সঙ্গে সব রকমের বিশ্বস্ত লোকজন।
          ছাদে উঠেছিলাম আমি আকাশের উদারতা, আলোর লক্ষ্য নিয়ে ভাবছিলাম, মেয়ে যে কখন নিচে নেমেছে খেয়াল করতে পারিনি, অপদার্থ মা!
‘আচ্ছা! সরল বিশ্বাসের মূল্য বুঝি এই ভাবে শোধ হয়’?

                                                               --------------------  

৪টি মন্তব্য:

  1. অসাধারন এক গল্প। ভিন্ন স্বাদের গল্প। C/O-সাহিত্যের আসরে C/O-বিশ্বাস।
    লেখিকাকে একটি পরামর্শ। স্বার্থপরের মত বলি, আপনি দয়া করে প্রতিদিন ছাদে উঠুন। আর আমরা এমন সুন্দর একটি করে গল্প পড়ি। :D

    উত্তরমুছুন
  2. ভাই সন্দীপ তোমাদের ভালোবাসা আমার আগামীদিনের চলার পথের মূল্যবান পাথেয়...স্মরণে রাখবো

    উত্তরমুছুন
  3. golper modhye diye ek onyo aswad pelam, purna di, tomar lekha tulonahin sundor ...

    উত্তরমুছুন

CSS Drop Down Menu
আমাদের লেখা পাঠান careofsahitya@gmail.com- এ মেল করে।