এখন
ডিসেম্বর মাস। পুরোপুরি শীতকাল। সন্ধ্যে থেকেই শিলিগুড়ি শহরটাঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে।
একটা হাল্কা শৈত্য প্রবাহ চলছে। ঘন কুয়াশার কারনে রাস্তার বাতিস্তম্ভ থেকে
বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটাও স্বমহিমায় প্রকাশিত হতে পারছে না। রাত বাড়ার সাথে সাথে ক্রমশঃ শহরের রাস্তাঘাট নিঝুম হয়ে পড়ছে।রাস্তার
সারমেয় গুলো ঠাণ্ডার প্রকোপ থকে নিজেদের বাঁচাতে বন্ধ দোকানের চাতালে শুয়ে থাকা
ভিখারি বা ফুটপাতবাসীদের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। শুধুমাত্র প্রতিদিনের মতো আজও এই
শহরের রাজপথ হিলকার্ট রোডের গুটিকয়েক ‘বার কাম রেস্ট্রুরেন্টের’ সামনে
আনন্দর মতো কিছু রিক্সাওয়ালা তাদের রিক্সা নিয়ে বাড়তি কিছু অর্থ আমদানির আশায়
দাঁড়িয়ে আছে। কিছু রিক্সাওয়ালা আছে, যারা বারোমাস দিনের বেলায় অন্য কাজ করে আর সন্ধ্যে হলেই রিক্সা নিয়ে এই সব বারগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে
থাকে। নেশাখোর কিছু মানুষদের তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে নিদৃষ্ট ভাড়ার বাইরে বাড়তি
কিছু পয়সা ইনকাম করে। এতে রোজগার বেশী হয়।তবে, মাঝে মধ্যে মত্ত প্যাসেঞ্জারদের সাথে রিক্সার ভাড়া নিয়ে
ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয়। আনন্দ সেটা জানতো।
তাই গোবিন্দর প্রস্তাবটাকে সে প্রথমে
সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, ‘দেখ
গোবিন্দ, এতে অনেক ঝামেলাও আছে। বাবুরা বারে বসে হাজার হাজার টাকার মাল টানে,
বেয়ারাকে এক’শ- দুশো টাকা বকশিস পর্যন্ত দেয়,
আর দশ-বিশ টাকা বেশী রিক্সা
ভাড়া চাইলেই তাদের মাথা গরম হয়ে যায়। তারা
রিক্সাওয়ালাদের গায়ে পর্যন্ত হাত তোলে। না রে ভাই, এইসব ঝামেলার কাজ আমি করতে
পারবো না’। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তাকেও যে শেষ পর্যন্ত একদিন রিক্সা চালাতে হবে
তা আনন্দ ভাবতে পারেনি।
আনন্দ
খুব সাদাসিদে বছর তিরিশের বিবাহিত ছেলে। ফ্লাই ওভারের নীচে ওর সাইকেল, রিক্সা
মেরামতেরছোট একটা দোকান আছে। এই দোকান থেকে প্রতিদিনের নুন-ভাতের
খরচটা মোটামুটি ভাবে উঠে আসে। কাছের এক বস্তিতে সে বউকে নিয়ে থাকে। এক বছর হল
সে লক্ষ্মীকে বিয়ে করেছে। মোটের উপর টেনেটুনে সংসারটা চলে যায়।
ইদানিং লক্ষ্মীর কথাবার্তা আনন্দর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্মী প্রায়ই
বলে, ‘দ্যাখো আমার আর এভাবে সংসার চালাতে ভালো লাগছে না। রোজ রোজ ডাল –ভাত ছাড়া আর
কিছুই জোটে না। নিজের সখ আহ্লাদ কিছুই
মেটাতে পারিনা। সেই কবে একটা সিনেমা দেখাতে নিয়ে গেছিলে। আজ পর্যন্ত একটা ভালো
শাড়ি কিনে দাওনি। ওদিকে রমেশ আর ওর বউকে
দেখ, প্রতি রোববার ওরা সিনেমা দেখতে যায়। রমেশের বউ প্রতিমা কি সুন্দর সব শাড়ি পড়ে’। আনন্দ
লক্ষ্মীকে বুঝিয়ে বলে, ‘রমেশের কথা আলাদা। ও একটা ট্রান্সপোর্ট
কোম্পানির গাড়ী চালায়। ভালো টাকা পায়। আবার উপরি কামাই করে। আমি যা কামাই করি তাতে
এভাবেই আমাদের চলতে হবে’।
‘তুমিও
তো রমেশের মতো গাড়ী চালাতে
পারো’। লক্ষ্মী আনন্দকে বলে।
আনন্দ
লক্ষ্মীর কথায় হেঁসে উঠে বলে, ‘গাড়ী চালান সহজ না। তার জন্য ট্রেনিং নিতে হয়।
লাইসেন্স লাগে। আর এসবের জন্য অনেক টাকার দরকার। এতো টাকা আমি কোত্থেকে পাবো।
আনন্দ লক্ষ্মীকে এভাবেই বোঝায়। কিন্তু লক্ষ্মী বুঝতে চায় না। আনন্দ ভাবে, সত্যিতো
আজ পর্যন্ত সে লক্ষ্মীকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দিতে পারেনি। বিয়ের পর সে লক্ষ্মীকে নিয়ে
মাত্র তিনটে সিনেমা দেখেছে।এইতো গতমাসে রমেশরা কয়েকজন মিলে বউ ছেলেপুলে নিয়ে কোচবিহারে রাসমেলা দেখতে গেছিল। ওদেরকেও যেতে
বলছিল। কিন্ত কিন্তু পয়সার অভাবে যেতে পারেনি। না, এবার কষ্টকরে হলেও এই রোববার
লক্ষ্মীকে একটা সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে।
আনন্দ
লক্ষ্মীকে রাতের শোয়ে সিনামা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। লক্ষ্মীও বেশ খুশী হয়েছিল। রাতে
বিছানায় লক্ষ্মীর পাশে শুয়ে আনন্দ
ভাবচ্ছিল, সে এরকমই খুশী দেখতে চায় লক্ষ্মীকে।
লক্ষ্মীকে সে খুব ভালোবাসে। একদিন
গোবিন্দর কথাতেই সে মা-বাপ মরা মেয়ে লক্ষ্মীকে বিয়ে করেছিল। গোবিন্দ বলেছিল, ‘একা
একা আর কদিন থাকবি। এবার একটা বিয়ে-থা কর। তুই যদি বলিস তাহলে আমি একটা মেয়ের খবর
দিতে পারি। মায়েটির নাম লক্ষ্মী। মা-বাপ নাই। দাদার কাছে থাকে’। আনন্দ আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, ‘আমি একটা ভাড়া
ঘরে থাকি। যা কামাই করি তাতে ঘর ভাড়া দিয়ে, বউ নিয়ে সংসার করা যাবে না’। গোবিন্দ অনেক যুক্তি দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘হাতের কাজ
যারা জানে, তাদের কোনদিন ভাত-কাপড়ের অভাব হয় না’। শেষে গোবিন্দর যুক্তির কাছে হার
মেনে আনন্দ বিয়েতে রাজি হয়েছিলো। প্রথম
প্রথম সব ঠিকঠাকই চলছিল। আনন্দ লক্ষ্মীকে
বউ হিসাবে পেয়ে খুব খুশী হয়েছিল। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সে এই কথাটা গোবিন্দকেও জানিয়েছিল। কিন্তু মাস ছয়েক যেতে না যেতেই আনন্দ বুঝতে পারল, বাস্তব কতটা কঠিন। ভাবনাতে
যা পাওয়া যায়, বাস্তবে তা পাওয়া যায় না। তবুও আনন্দ সবসময় লক্ষ্মীকে খুশী রাখার
চেষ্টা করে। তাই সে এখন রোববারেও একবেলা
দোকান খোলা রাখে।
এরই
মধ্যে একদিন দুপুর বেলায় আনন্দ ঘরে খেতে এসে দেখে লক্ষ্মী বিছানায় শুয়ে আছে। উনুন
পর্যন্ত জ্বালায়নি। জিজ্ঞেস করাতে লক্ষ্মী বলল, ‘আমার মাথাটা ঘোরাচ্ছে। বমি হচ্ছে’। আনন্দ বলল, ‘এখুনি চল
হাসপাতালে। ডাক্তার দেখাতে হবে’।
‘ডাক্তার
দেখানোর দরকার নেই। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে’। লক্ষ্মী বলল। আনন্দ লক্ষ্মীর কথায় আমল
না দিয়ে একটা রিক্সা ডেকে জোরকরে লক্ষ্মী
কে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার বাবুর কাছ থেকে আনন্দ জানতে পারে যে, লক্ষ্মীর
পেটে বাচ্চা এসেছে। কথাটা শুনে আনন্দখুব খুশী হল। ডাক্তার বাবু একটা কাগজে কয়েকটা ওষুধ লিখে
আনন্দর হাতে দিয়ে বললেন, ‘সামনের ন্যায্য
মূল্যের ওষুধের দোকান আছে। সেখান থেকে এই ওষুধগুলো কিনে নিও’। আবার কবে
আসতে হবে, সেটাও আনন্দ ডাক্তার বাবুর কাছ থেকে জেনেনিল। আনন্দ ওষুধের দোকানের
ছেলেটির হাতে কাগজটা দিয়ে বলল, ‘আমাকে এই ওষুধগুলা দেন দাদা’।দোকানের ছেলেটি ওষুধের কাগজটা হাতেনিয়ে দেখে বলল, ‘এখানে
দুটো ওষুধ পাবে। বাকি তিনটে ওষুধ
হাসপাতালের বাইরে দোকান থেকে কিনতে হবে’। আনন্দ সেখান থকে ওষুধ কিনে বাকি ওষুধ
হাসপাতালের বাইরের দোকান থেকে কিনে নিল।
আনন্দ
পকেটে হাত দিয়ে দেখল, মাত্র এক’শ টাকা অবশিষ্ট আছে। এখনি কিছু টাকা জোগাড় করতে
হবে। পকেটে যা ছিল তা দিয়ে আজ সে ওষুধ কিনেছে। লক্ষ্মীকে এখন মাঝে মধ্যে ভালো মন্দ খাওয়াতে হবে। কিন্তু সে
ভেবে পাচ্ছিল না, কি ভাবে টাকার ব্যবস্থা করবে। হঠাৎ তার গোবিন্দর কথা মনে পড়লো। কিন্তু সন্ধ্যার আগে সে গোবিন্দর দেখা পাবে না। কারন,
গোবিন্দ সকালেই রিক্সা নিয়ে বেড়িয়ে গেছে। সন্ধ্যার আগে ফিরবে না। সন্ধ্যের সময়
আনন্দ গোবিন্দের সাথে দেখা করে বলল,
‘গোবিন্দ আমি রাতে রিক্সা চালাবো। তুই আমাকে একটা রিক্সার জোগাড় করে দে।আমার এখন টাকার দরকার’। আনন্দর কথায় গোবিন্দ অবাক হয়ে বলে, ‘হঠাৎ তুই আবার রিক্সা
চালাতে চাইছিস কেন’? আনন্দ তখন লক্ষ্মীর বিষয়টা
গোবিন্দকে বলে। গোবিন্দ সব শুনে
বলে, ‘তুই বাবা হবি।এতো খুব ভালো খবর। এক কাজ কর, তুই রাতে আমার রিক্সাটা চালা।
আমার শরীরটা ঠিক নেই, তাই সন্ধ্যার পরে আমি রিক্সা চালাই না। পরে মালিকের সাথে কথা
বলে তোর জন্য একটা রিক্সার ব্যাবস্থা করে দেব’।
বাড়ি
ফিরে আনন্দ রাতে রিক্সা চালানোর কথাটা লক্ষ্মীকে বলতে যাবে, তার আগেই লক্ষ্মী বলল, ‘আমি এই বাচ্চা রাখতে চাই
না’।আনন্দ নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে বলল, ‘এ তুমি কি বলছ লক্ষ্মী?
এরকম অলুক্ষণে কথা বলোনা’।
‘আমি
ঠিকই বলছি। এখন সংসারটা কোনমতে চলছে। এরপর
একটা বাচ্চা হলে খরচা বাড়বে। তাছাড়া আমি এখন মা হতে চাই না’। লক্ষ্মী বলল। আনন্দ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লক্ষ্মীকে বলল, ‘দ্যাখো,
এমন অনেকে আছে যাদের বাচ্চা হয় না। একটা
বাচ্চার জন্য তারা কত পূজা, কত মানত করছে। আর
তুমি কিনা বাচ্চা জন্ম দিতে চাইছনা। ভেবো
না লক্ষ্মী। কাল থেকে আমি দিনের বেলায় দোকানদারি করবো আর রাতের বেলায় রিক্সা
চালাবো। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে’।
এরপর
আনন্দ প্রতি দিন বিকেল পর্যন্ত নিজের দোকানদারি করে। তারপর সন্ধ্যের পর গোবিন্দর
রিক্সা চলায়। লক্ষ্মী এখনো মাঝে মাঝেসেই অলুক্ষণে কথাটা বলে। আনন্দ লক্ষ্মীকে বলে
দিয়েছে, সে কিছুতেই তাকে বাচ্চা নষ্ট করতে দেবে না। রিক্সার ওপর বসে আনন্দ
লক্ষ্মীর কথাগুলোই ভাবছিল। আজ
রিক্সা নিয়ে বেরোবার সময় সে লক্ষ্মীকে বলেছিল, রাতে তোমার জন্য একটা শাড়ি নিয়ে
আসবো। সেইমত আজ আনন্দ রিক্সা নিয়ে বেড়িয়ে সোজা মহাবীর স্থানে এল।একটা কাপড়ের দোকান
থেকে লক্ষ্মীর জন্য একটা সুন্দর কাপড় কিনে রিক্সার সিটের নীচে যত্ন সহকারে রেখে
দিল। তারপর সেখান থেকে হিলকার্ট
রোডের নির্দিষ্ট জায়গায় রিক্সা নিয়ে
দাঁড়ালো।
রাত
প্রায় সাড়ে এগারটা বাজে। রিক্সাটা গোবিন্দর বাড়ীতে রেখে শাড়ীর প্যাকেটটা হাতে নিয়ে
আনন্দ নিজের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।একটু
ঠেলা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। আনন্দ একটু অবাক হল। এমনটাতো হবার কথা নয়। প্রতিদিনই
তো লক্ষ্মী দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকে। আনন্দ এসে ডাকলে তবে সে দরজা খোলে। তবে কি আজ
লক্ষ্মী দরজা বন্ধ না করেই শুয়ে পড়েছে। আনন্দ ঘরের ভেতরে ঢুকে দেখে ঘর অন্ধকার। সে
কোমর থেকে দেশলাইটা বার করে একটা কাঠি জ্বালায়।
তারপর ঘরের এক কোনে রাখা লন্ঠনটা জ্বালায়। দেখে ঘরে লক্ষ্মী নেই। এত
রাতে লক্ষ্মীকে ঘরে দেখতে না পেয়ে আনন্দ
অবাক হল। প্রথমে সে ভাবল, লক্ষ্মী বুঝি
প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে গেছে। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর লক্ষ্মীর
দেখা না পেয়ে আনন্দর দুঃশ্চিন্তা বেড়ে গেল। সে কি করবে ভেবে পেলনা। এতো রাতে কাকেই
বা ডাকবে। হঠাৎ আনন্দের নজর জামাকাপড় রাখা
দড়িটার দিকে গেল। দেখল, দড়িতে লক্ষ্মীর জামাকাপড় একটাও নেই। এমনকি বিয়েতে লক্ষ্মীর
বাড়ীর থেকে যে টিনের বাক্সটা দিয়েছিল সেটাও নেই। আনন্দ বুঝতে পারে তার সর্বনাশ হয়ে
গেছে। লক্ষ্মী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। ঘর আজ লক্ষ্মীশূন্য হয়ে গেলো। কিন্তু সে যে তাকে
খুব-ই ভালবেসেছিল। সেই ভালবাসার যে এই প্রতিদান পাবে, তা আনন্দ স্বপ্নেও ভাবেনি।
এই ভালবাসা কি অন্য কেউ লক্ষ্মীকে দিতে
পারবে? আনন্দর চোখে জল। সে প্যাকেট থেকে লক্ষ্মীর জন্য আনা শাড়ীটা বের করে দেখতে
লাগলো। হঠাৎ লক্ষ্মীর পেটের বাচ্চাটার কথা মনে হতেই আনন্দর বুকটা এক অজানা শঙ্কায়
কেঁপে উঠল। শেষে লক্ষ্মী কি তার বাচ্চাটাকেও......। আনন্দ আর ভাবতে পারে না। তার
মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। সে ঘরের মেঝেতে বসে পড়ল।খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে, রাতের
অন্ধকার মুছে গিয়ে নতুন দিনের আলোকচ্ছটা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।আনন্দের মনে হল, একদিন এই ভোরের আলোর মতোই লক্ষ্মী তার
জীবনে এসেছিল। আজ, তার জীবনটাকে ঘন
অন্ধকারে ঢেকেসে চলে গেল...।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন