বন্ধু হলেও আমাদের তু-তু-ম্যায়-ম্যায় চলতেই থাকত, আমি আম-আদমী; খেটে খাই আর-কি। তবে নীলেশের দারুন প্রতিভা ; ছবিতে,সুরে,ছন্দে-গদ্যে আহামরি। ওর বিষয় গুলতে যে হিংসা হত না- তা নয় বটে।
নীলেশ রোজই সন্ধ্যায় আমার ঘরে আসত, চা-চর্চা-করচা সবই চলত। বেশ কিছু দিন সেই মানুষ বেপাত্তা! অবাক লাগলেও কিছু করার ছিল না, কারন কাজের চাপে কখনোই ওর ঘর চেনা হয়ে ওঠেনি।
দিন সাতেক পর, রবির দুপুরে অনভ্যস্ত কলিং বেলটা বিচ্ছিরী শব্দে বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখি শ্রী-মান বিচ্ছিরী চেহারায় দাড়িয়ে। চুল তেল-জলহীন, গাল দু’টো চৈত্রের ফাটা জমি, আর ঠোঁট ফেটে রক্ত জমে, পড়নের পাঞ্জাবি খানা ধুলো ময়লায় নিজের রং হারিয়েছে। ঘরে এনে পরিচর্যায় বিকেল গড়াল।
হঠাৎ নীলেশ তার যক্ষের ধন আমার হাতে ধড়িয়ে বলল; বন্ধু এ আমার সৃষ্টি, তোমার হাতেন্যাস রাখলাম। ফিরে এলে বুঝিয়ে দিও। খেয়ালী-হেয়ালী কথা ওর মুখের মুদ্রা। তবুও আজ যেন সুর অন্য ছন্দে বাজছে, নীলেশকে বড্ড অচেনা লাগছে। ভারি হয়ে যাওয়া পরিবেশটাকে হালকা করবার জন্য বললাম- তুমি তো জন্মান্ধ, তা তোমার ছবিতে-সুরে-ছন্দে-গদ্যে এর বিবরণ এত সুক্ষ চুল-চেরা বিচক্ষন কি করে দাও?
ঠোঁটের
কোনটা অল্প বাঁকিয়ে ভারি গলায় বলে উঠল- বন্ধু স্বপ্ন দেখো তো তুমি?
হ্যাঁ
দেখি, কিন্তু তার এর সাথে কি সম্পর্ক?
আছে,
সম্পর্ক আছে।
দিনের আলোয় যা দেখা
যায় না সেটাই তো সবাই রাতের আঁধারে চোখ
বুজে খোঁজে। তুমিও খোঁজ। আমার সুবিধা এটাই, যে আমার ভোর হয়না।
নীলেশের
হেয়ালী বেড়েই চলেছে,
নড়ে বসে
বললাম, তার মানে?
নীলেশ নিজের মুখে হাতটা বুলিয়ে নিয়ে বলল-
বন্ধু তুমি কি ভোরের সূর্যকে কমলা থেকে লাল হতে
দেখেছ? তুমি কি সকালের সেই পাখীকে চেন, যে প্রথম আলোর সাক্ষী হয়ে আছে? তুমি কি
হলুদ সর্ষে ক্ষেতে মৌমাছির পরাগ স্নান দেখেছ? দেখেছ কি বৃষ্টির প্রথম বিন্দুতে
মাটির আলিঙ্গনের সুখ?
নীলেশের
অহংকারী হাসিতে ঘরটা যেন কেপে উঠল, হাসিটা যেন ওর হয়ে অন্য কেউ হাসচ্ছে। মাথাটা
ভন্ ভন্ করে ঘুরতে লাগল। মনে পরল নিজের ব্যর্থতা, কাজের চাপে- কি সকাল আর কি যে
বিকাল বেমালুম গুলিয়ে যেত রাতের ঘুমের কোলে।
নীলেশ
এবার একটু চাপা গলায় বলে উঠল, সুন্দরের মহিমা তো রাতের আঁধারেই লুকিয়ে থাকে। তবে
এবার এই আঁধারের বিরতি দিতে চাই।আমি সূর্যদয় দেখতে চাই। তোমার কাছে আমার সব সৃষ্টি
সব আধার রেখে যাচ্ছি, ফিরে এলে বুঝিয়ে দেবে কিন্তু বন্ধু।
নীলেশের
কথা শেষ হবার আগেই গত সাতদিন গুম হওয়ার কারন জানতে চাইলাম,শ্রীমানের মুখে কুলুপ; শেষমেস না পেরে যক্ষের ধনের মত আগলে রাখা ব্যাগ খানা ছিনিয়ে ঝাঁপি খুললাম। যা
দেখলাম তা দেখবার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
সাদা
কার্টিস পেপারের উপরে হলুদ সবুজ লাল নীল রং ছড়িয়ে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আঁকা নগ্ন
গৌরাঙ্গীর চিত্র। যেন সে জিবন্ত ঐ ক্যানভাসে। শরীর হিম হেয়ে গেল, সন্দেহ হল ওর
অন্ধেত্বের উপর। এক টানে কালো চশমা গুড়িয়ে দিলাম মাটিতে। সাথে সাথে নীলেশের হাসিতে
ঘরটা নরে উঠল। নীলেশ ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতে গিয়ে টেবিলের কোনায় হোঁচট খেয়ে আমার উপরে
পড়তে পড়তে সামলে নিল নিজেকে। চশমা ছাড়া নীলেশের চোখ দুটো ভীষণ অদ্ভুত লাগছিল, কালো মনি
দুটো যেন আমাদের মত স্বাভাবিক নয়। অনেকটা নিলছে কাঁচের গুলির মতো।
নীলেশ ঘর থেকে বেড়িয়ে যাবার আগে ওর ব্যাগটা গুছিয়ে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল যাই বন্ধু তারা আছে। অবুঝ আর পাথর হয়ে দৃষ্টি আঁটকে রইল মেঝেতে পরে থাকা নগ্ন গৌরাঙ্গীর ছবিতে। সব হিসাব যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল মাথার ভেতরে। বাইরে বৃষ্টির মধ্যে তীব্র বিদ্যুৎ-আলোয় আর মেঘ গর্জনে নীলেশ আলো-আঁধারে মিলিয়ে গেল।



দারুন গল্প। অসাধারন সব গল্পের মোড়। বেশ কিছু বানান চোখে পড়ল, তবে গল্পের উত্তেজনায় ও বাঁধুনিতে সেগুলো কোন অসুবিধার সৃষ্টি করে নি। এবং সেখানেই লেখিকার কৃতিত্ব। গল্পের শেষটি অসাধারন। লেখিকাকে শুভেচ্ছা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ Sandip Mondal.
উত্তরমুছুনআমি লজ্জিত আমার ভুলের জন্য। গল্পের ঘটনায় আমি মজে থাকায় ত্রুটি গুলো চোখ এরিয়ে গিয়েছে, এর জন্য আমি দারুন লজ্জিত। আশা করছি পরবর্তীকালে এমন হবে না।
সকলকে আরএকবার ধন্যবাদ জানাই।